উপনির্বাচনে মমতার হাওয়া

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:২৪

ভবানীপুরে ৩০ সেপ্টেম্বর বিধানসভা উপনির্বাচন। ফল প্রকাশ ৩ অক্টোবর। ইতিমধ্যে ভবানীপুর এলাকা ব্যানার, হোর্ডিং, ফ্লেক্স-এ সয়লাব হয়ে গেছে। অন্যদিকে তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, দিদির জয় স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। হাজার হাজার ভোটে জিতে যাবেন দিদি। অতীতের পরিসংখ্যানও সে কথাই বলে। তার ওপরে খোদ তৃণমূল নেত্রী দিল্লি গিয়ে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে অনুরোধ করেছেন তার বিরুদ্ধে ভবানীপুরে প্রার্থী না দেওয়ার জন্য। সেই অনুরোধ মেনে কংগ্রেস প্রার্থীও দেয়নি। ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে ২০১১ সালে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন সুব্রত বক্সি। ৮৭ হাজার ৯০৩ ভোট পেয়ে সিপিএম-এর নারায়ণ প্রসাদ জৈনকে ৪৯ হাজার ৯৩৬ ভোটে হারিয়েছিলেন। তাঁর ভোটের হার ছিল ৬৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অন্যদিকে নারায়ণ প্রসাদ জৈন পেয়েছিলেন ২৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এরপর বিজেপির প্রার্থী রামচন্দ্র জয়সওয়ালের ভাগ্যে জুটেছিল মাত্র ৫ হাজার ৭৮ ভোট। সে বছর সুব্রত বক্সিকে এই কেন্দ্র থেকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ভবানীপুরেই উপনির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। সেবার মমতার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সিপিএম প্রার্থী নন্দিনী মুখোপাধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছিলেন ৭৩ হাজার ৬৩৫ ভোট। আর নন্দিনী মুখোপাধ্যায় পান ১৯ হাজার ৪২২ ভোট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৫৪ হাজার ২১৩ ভোটে  জয়ী হন। মমতা ভোট পেয়েছিলেন ৭৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ। সিপিএম-এর পক্ষে ছিল মাত্র ২০ দশমিক ৪৩ শতাংশ ভোট। এরপর ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুরে প্রার্থী হয়েছিলেন। সেবার তাঁর বিপক্ষে ছিলেন বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী দীপা দাশমুন্সী। মমতা ভোট পেয়েছিলেন ৬৫ হাজার ৫২০টি। আর দীপা দাশমুন্সী পেয়েছিলেন ৪০ হাজার ২১৯ ভোট। তবে সেবার তৃণমূল সুপ্রিমোর জয়ের ব্যবধান কমে হয়েছিল ২৫ হাজার ৩০১ ভোট। অন্যদিকে বিজেপির চন্দ্রকুমার বসু পেয়েছিলেন ২৬ হাজার ২৯৯টি ভোট। তৃণমূল, কংগ্রেস ও বিজেপির ভোট ছিল যথাক্রমে ৪৭ দশমিক ৬৭, ২৯ দশমিক ২৬ ও ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২০১৬ সালে বিজেপির ভোট প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছিল। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। বিজেপির রুদ্রনীল ঘোষের বিরুদ্ধে তিনি ২৮ হাজার ৭১৯ ভোট  জয়ী হয়েছিলেন। শোভনদেব পেয়েছিলেন ৭৩ হাজার ৫০৫ ভোট। রুদ্রনীল ঘোষ পেয়েছিলেন ৪৪ হাজার ৭৮৬ ভোট। সংযুক্ত  মোর্চার প্রার্থী কংগ্রেসের সাদাব খান পান মাত্র ৫ হাজার ২১১ ভোট। তৃণমূল এখানে পায় ৫৭ দশমিক ৭১ শতাংশ ভোট। বিজেপি পায় ৩৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। আর কংগ্রেস পায় মাত্র ৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ ভোট। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম দুটি কেন্দ্র থেকেই প্রার্থী হবেন বলে জানিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে শুধু নন্দীগ্রামে প্রার্থী হন তিনি। নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজয়ের পর তিনি এবার ভবানীপুরে উপনির্বাচনে ফিরছেন। নন্দীগ্রামে হাই ভোল্টেজ লড়াইয়ের পর ভবানীপুরের উপনির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা প্রবল আশাবাদী। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, বাংলার ঘরের মেয়ের ওপরই আস্থা রাখবেন এই এলাকার মানুষ। কিন্তু বিজেপি কি সহজেই জমি ছেড়ে দেবে? তাহলে কী ভাবছে বিজেপি? ভবানীপুরে বিজেপি যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফাঁকা জমি ছেড়ে দেবে না, সে কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু মমতাকে তারা কীভাবে আটকাবেন? সহজ জয় মেনে না নিলেও মমতাকে বেগ দিতে তাদের কী পরিকল্পনা? অনেকেই বলছেন, তৃণমূলের প্রাক্তনীকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে মমতাকে কোণঠাসা করার ছক কষছে বিজেপি। উপনির্বাচনের দিন ঘোষণা হতেই তৃণমূল কংগ্রেস জোর প্রচারে নেমে পড়েছে। ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরেছে বলে প্রচারে নেমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপুল জয়ের সম্ভাবনা তুলে ধরছেন তৃণমূলের কর্মীরা। তাদের কথায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যাকেই প্রার্থী করুক বিজেপি, ঘরের মাঠে শোচনীয় পরাজয় স্বীকার করতে হবে তাকে। শুক্রবার দুপুরে কোভিড প্রটোকল মেনে ভবানীপুর বিধানসভা উপনির্বাচিনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী হলেন প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালন্ধ। এ দিনই বিজেপির পক্ষ থেকে প্রিয়াঙ্কার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী কদিন যে রাজ্য রাজনীতির নজর থাকবে ভবানীপুরে তা বলাই বাহুল্য। কারণ এই উপনির্বাচনের ফলাফল থেকেই নির্ধারিত হবে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। প্রসংগত, চার মাস আগে বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্রের লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দুর কাছে ১ হাজার ৯৫৬ ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন। যদিও সেই ফলাফল নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা চলছে। তবু নিয়ম অনুসারে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকতে হলে তাকে ছয় মাসের মধ্যে কোনো একটি কেন্দ্র থেকে জিতে আসতে হবে। অনেক তালবাহানার পর ভবানীপুরসহ আরো দুই কেন্দ্রে নির্বাচনের কথা জানায় নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন ভবানীপুর কেন্দ্রের দিন ঘোষণা করতেই তৃণমূলের তরফে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম যেমন ঘোষণা করা হয়, পাশাপাশি কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই মমতার হয়ে জোর কদমে প্রচারে নেমে পড়ে তৃণমূল। কিন্তু রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল প্রার্থী ঘোষণা করে উঠতে হিমশিম খাচ্ছিল। কে দাঁড়াবে? দিলীপ ঘোষ শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করলেন। পারলেন কই? সে যাক, বিজেপির তরফে নাকি কেউ প্রার্থী হতে চাইছিলেন না। তবে শেষমেশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী খুঁজে পেল। নাম ঘোষণা করল—প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল। পেশায় আইনজীবী প্রিয়াঙ্কা এই কয়েক মাস আগে হয়ে যাওয়া বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন এন্টালি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। তিনি ৫৮ হাজার ২৫৭ ভোটের ব্যবধানে তৃণমূলের স্বর্ণকমল সাহার কাছে হেরে যান। এর আগে ২০১৫ সালের কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের স্বপন সমাদরের কাছে হেরে যান ১৯ হাজার ১৩৪ ভোটে। তবু সব দিক চিন্তা করেই প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালের নামে শিলমোহর দিয়েছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তারা মনে করছেন, যেখানে কেউই মমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে রাজি হচ্ছেন না, সেখানে প্রিয়াঙ্কাই যথেষ্ট। তাছাড়া বিজেপি নাকি এই কেন্দ্রে একজন নারী প্রার্থীর কথাই ভাবছিল। ভবানীপুর কেন্দ্রে প্রার্থী হিসেবে এই আইনজীবীর নাম নাকি শুভেন্দু অধিকারীও বলেছিলেন। এ বিষয়ে শাহ-নাল্ডার সঙ্গে আলোচনা করতে তিনি দিল্লি পৌঁছেছিলেন। তার পরই নাকি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শিলমোহর দিয়েছে। এছাড়া ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে প্রিয়াঙ্কার আইনি লড়াইটাও মনে রেখেছে তার দল। কখনো সুপ্রিম কোর্টে, কখনো কলকাতা হাইকোর্টে মামলা লড়েছেন। ভবানীপুরে প্রিয়াঙ্কাকে জেতাতে গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অর্জুন সিংকে। তাকে সাহায্য করবেন সৌমিত্র খাঁ। এছাড়া অন্যান্য সহকারী তো আছেই। কিন্তু বিজেপির কেউই যেখানে মমতার বিরুদ্ধে লড়তে রাজি হলেন না, সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালকেই প্রার্থী করল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। প্রশ্ন, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের মতো ভবানীপুরের উপনির্বাচনেও কি প্রার্থী নিয়ে নিজেদের পছন্দ রাজ্য নেতাদের ওপরে চাপিয়ে দিলেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা? নাকি কেউই যখন জেনে-বুঝে গো হারা হারতে রাজি নন, তখন লড়াইয়ে নারী প্রার্থীকেই এগিয়ে দিল বিজেপি? কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল বাবুল সুপ্রিয়ার আইনি উপদেষ্টাও ছিলেন। ২০১৪ সালে মোদী ঝড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। শুরুতেই দলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করেছেন। ছয় বছর পর, ২০২০ সালের আগস্টে তাকে পশ্চিমবঙ্গের ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার (বিজেওয়াইএম) সহসভাপতি করা হয়। ওয়েল্যান্ড গোল্ডস্মিথ স্কুল, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক প্রিয়াঙ্কা হাজরা ল কলেজ থেকে আইন ডিগ্রি পেয়ে প্র্যাকটিস করেন। গুঞ্জন উঠেছিল, নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ ছেড়ে আবার ভোটে লড়বেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, জানিয়ে দেন, শুভেন্দু প্রার্থী হবেন না। আলোচনায় ছিল রুদ্রনীল ঘোষের নামও। শেষ বেলায় দৌড়ে কীভাবে এগিয়ে গেলেন এই তরুণ আইনজীবী? বিজেপির তাবত বড় নেতাই ভবানীপুরে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। সেখানে ভবানীপুরের বিজেপি প্রার্থী হিসেবে প্রিয়াঙ্কার নাম গত কয়েক দিন ধরেই হাওয়ায় ভাসছিল। গত দুই দিন ধরে ফেসবুকে কার্যত ভবানীপুরে উপনির্বাচনের জন্য নিজের সমর্থনে প্রচারও শুরু করে দিয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা। এ নিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকে প্রশ্ন করা হলে তার জবাব ছিল, ‘প্রতিপক্ষ যেখানে মুখ্যমন্ত্রী, সেখানে যাকে তাকে নয়। বিজেপি রাজ্য সভাপতি এ-ও জানান, প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালের নাম দিল্লির কাছে পাঠানোও হয়নি। ধরেই নিতে হয়, নিমি্চতভাবে কেউ হারতে চায়নি বলেই প্রিয়াঙ্কাকে প্রার্থী করা হয়েছে।

n লেখক :ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক