শিক্ষার্থীরা নতুন শিক্ষাক্রম পেতে যাচ্ছে ২০২৩ সাল থেকে। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাক্রম পুরোপুরি চালু হবে ২০২৫ সালের মধ্যে। নতুন শিক্ষাক্রমে রয়েছে ভিন্নতা। রয়েছে বড় পরিবর্তন। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়নের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে এই শিক্ষাক্রমে।
নতুন এই শিক্ষাক্রম অনুযায়ী, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা থাকবে না। আর নবম-দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্যের মতো বিভাজন থাকবে না। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন বই থাকবে। এসএসসির আগে থাকবে না কোনো পাবলিক পরীক্ষা।
রূপরেখায় বর্তমানে চালু থাকা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেডিসি) ও সমমানের পরীক্ষার কথা উল্লেখ নেই। তবে এটি থাকবে কী থাকবে না সেটা নির্ভর করবে সরকারের ওপর। বর্তমানে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই দুটি শ্রেণিতে নতুন আদলে পরীক্ষা চালু হয়।
গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন শিক্ষামন্ত্রী।
নতুন শিক্ষাক্রম কোন শ্রেণিতে কখন : আগামী বছর থেকে প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণি এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পাইলটিং শুরু হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ১০০টি প্রতিষ্ঠানে পাইলটিং হবে। আর ২০২৩ সাল থেকে প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে শুরু হবে নতুন শিক্ষাক্রম। ২০২৪ সালে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণি এবং ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে এ শিক্ষাক্রম শুরু হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া ২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে ও ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে এই শিক্ষাক্রম চালু হবে।
মূল্যায়ন হবে যেভাবে :প্রাথমিকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়েই ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে। কোনো পরীক্ষা থাকবে না। আর চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে গিয়ে শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ৬০ শতাংশ, যাকে ধারাবাহিক মূল্যায়ন বলা হচ্ছে। আর ৪০ শতাংশ মূল্যায়ন হবে ক্লাস শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে। এই মূল্যায়নকে সামষ্টিক মূল্যায়ন বলা হচ্ছে। ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণিতে বিদ্যালয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ হবে সামষ্টিক মূল্যায়ন। নবম ও দশম শ্রেণিতে পাঁচটি শিখনকালে ৫০ ভাগ মূল্যায়ন হবে এবং বাকি ৫০ ভাগ সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ৩০ ভাগ ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং ৭০ ভাগ সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে।
দশমে গিয়ে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা :আগে নবম-দশম মিলে পাবলিক পরীক্ষা হতো। নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী দশম শ্রেণির পর একটি পাবলিক পরীক্ষা হবে। তবে তা হবে শুধু দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে। দশম শ্রেণির ১০টি বিষয়ের মধ্যে পাঁচটি বিষয়—বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান হবে ৫০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে ও ৫০ শতাংশ শিখনকালীন মূল্যায়নের ভিত্তিতে। অবশিষ্ট পাঁচটি বিষয় (ডিজিটাল প্রযুক্তি, জীবন ও জীবিকা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি) হবে শতভাগ শিখনকালীন মূল্যায়নের ভিত্তিতে। আর একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুটি পাবলিক পরীক্ষা হবে, অর্থাত্ প্রতি বর্ষ শেষে হবে পাবলিক পরীক্ষা। আর এই দুই পরীক্ষার ফলের সমন্বয়ে এইচএসসির চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে।
থাকবে না কোনো বিভাজন :নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী নবম শ্রেণি থেকে গ্রুপের বিভাজন আর থাকবে না। আগে অষ্টম থেকে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরই শিক্ষার্থীদের একটি বিভাগ পছন্দ করতে হতো। অর্থাত্ বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের যে কোনো একটিতে যেতে হতো। তবে নতুন প্রণীত জাতীয় শিক্ষাক্রমে এ বিভাজন থাকছে না। নবম ও দশম শ্রেণিতে সব শিক্ষার্থীই একই বিষয় পড়বে। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, নবম ও দশমে শিক্ষার্থী সবাই একই বিষয়ে পড়াশোনা করবে। এ পর্যায়ের কোনো শিক্ষার্থী বিশেষ কোনো বিষয়ে পারদর্শী থাকলে, তাকে সে বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে। তবে উচ্চমাধ্যমিক অর্থাত্ এইচএসসি থেকে শিক্ষার্থীদের আগের মতো বিভাগ বিভাজন করতে হবে।
রূপরেখায় পিইসি-জেএসসি নেই : প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার কোনো নতুন শিক্ষাক্রম রূপরেখায় নেই। এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, সমাপনী প্রতি ক্লাসেই থাকবে। তৃতীয় শ্রেণির পর থেকে সব ক্লাসেই সমাপনী পরীক্ষা আছে। তিনি বলেন, পঞ্চমে এবং অষ্টমেও আমরা সনদ দিয়ে দেব। শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, এখনই বলে দেওয়া যাবে না পরীক্ষা (পিইসি ও জেএসসি) হবে কি হবে না। তবে মূল্যায়ন হবে।
