কামাল হোসাইন
মিষ্টি দুটি মেয়ে। যেনবা দুটো তুলোর পুতুল। বড্ডো মায়াকাড়া। পিঠেপিঠি দুই বোন। ওদের সঙ্গে সাকুল্যে দুদিন দেখা হয়েছে কামরুল সাহেবের। ওরা জন্মসূত্রে আমেরিকান। আমেরিকার ফ্লোরিডায় থাকা মা শামীমা ইয়াসমিন এবং বাবা মোহাম্মদ ফায়েজ দুজনই বাংলাদেশি। শামীমা ইয়াসমিন কামরুল সাহেবের স্ত্রীর চাচাত বোন। সম্পর্কে বড় আপু। এক মাসের জন্য ওরা আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে এসেছে।
মেয়ে দুটোর দাদাবাড়ি রংপুর। আর নানাবাড়ি ঠিক উলটাদিকে ঝিনাইদহ। বিদেশগামী হওয়ার সুবাদে লকডাউনের মধ্যেও গাড়ি নিয়ে দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ঘুরতে কোনোই অসুবিধা হয়নি তাদের। তবে তাদের রংপুর-ঝিনাইদহ করতে-করতে বলা যায় কাহিল অবস্থা। এর মধ্যে দেখতে দেখতে কেটে গেল এক মাস। এখন আবার গন্তব্যে ফেরার পালা।
কামরুল সাহেব মেয়ে দুটোর সম্পর্কে খালু হন। তিনি চাকরিসূত্রে ঢাকায় থাকেন। অতিমারি করোনার কারণে ঝিনাইদহে ছিলেন কুরবানি ঈদের সময়টাতে। ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফিরতে হবে, তাই তিনি ঢাকায় যাত্রার সঙ্গী হয়ে আসেন প্রায় ছয় ঘণ্টার রাস্তা। ফলে ওদের সঙ্গে এরই মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন তিনি। ইংরেজিতে ছোট ছোট বাক্যে কথা বললেও সুন্দর করে বাংলাতেও কথা বলে ওরা।
এক মাসের জন্য ভাড়া করা মাইক্রোবাস দুপুর দুটোয় ছেড়ে এসে মোটামুটি সাড়ে সাতটায় তেজকুনিপাড়ায় পৌঁছে গেল। কামরুল সাহেব চেয়েছিলেন, মামাদের বাসায় আজ আর উঠবেন না। ক্লান্তি ঝাড়তে সরাসরি কমলাপুরের বাসায়ই চলে যাবেন। কিন্তু বাদ সাধলেন রোকন মামা এবং ফারিফতা। সে বলল, না তুমি এখন যাবে না। চা খেয়ে যাবে। মামাও বললেন, তোমাকে বেশিক্ষণ আটকাব না। হালকা নাস্তা করে চলে যেয়ো। উপেক্ষা করতে পারেননি কামরুল সাহেব।
এরই মধ্যে ফায়েজ ভাইয়ের সঙ্গে কয়েকবার কথা হয়েছে কামরুল সাহেবের। যেদিন তাদের আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা, সেদিন সকালেই কথা হলো আরেকবার। ফায়েজ ভাই বললেন, পারলে একবার এসো। আবার একটু দেখা হোক যাবার আগে। রাত বারোটার দিকে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা করতে হবে।
কামরুল সাহেবও সম্মত হয়ে লকডাউনের বিধিনিষেধ ভেঙে দুপুরের পর বিকেলে রওনা হলেন তেজকুনিপাড়ার উদ্দেশ্যে। ভেবেছিলেন, ঐ এলাকায় গিয়ে কিছু কিনেই ঐ বাসায় ঢুকবেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখেন, সব খাঁ খাঁ। এরই মধ্যে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। অগত্যা ছোট্ট মেয়ে দুটোর জন্য কিছু চিপস, ম্যাংগো জুস, ডেইরি মিল্ক কিনলেন।
ফারিফতা বসার ঘরে কামরুল সাহেবের পাশে বসেই টিভিতে কার্টুন দেখছিল। বেশ কিছু সময় পর তিনি সঙ্গে নেওয়া প্যাকেট এবং কিছু শিশুতোষ বাংলা বই ফারিফতার হাতে দিলেন। ওগুলো হাতে পেয়েই সে তার মায়ের ঘরে দৌড় দিল। অল্পক্ষণের মধ্যে ফিরেও এলো আবার। জানা গেল ফারিয়াত তখন ঘুমাচ্ছে।
টুকটাক কথা হচ্ছে। গল্প হচ্ছে। ফারিফতার চঞ্চলতা দেখছেন মুগ্ধ হয়ে। আর ভাবছেন, মানুষ সত্যিই পাখি। আজ এখানে কেমন ছোটাছুটি করে সময় কাটাচ্ছে ওরা। আর কালই কত দূরের দেশ, যেখানে যেতে বিমানেই ছত্রিশ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে গিয়ে হাজির হবে! পৃথিবী বড়ই বিচিত্র!
সন্ধ্যার পর ফারিয়াত ঘুম থেকে উঠল। বসার ঘরে এসে একবার ‘হাই খালু’ বলে গেল কামরুল সাহেবকে। তিনিও মিষ্টি হেসে হাই বললেন।
একটু পর বসার ঘরে রোকন মামা আর ফায়েজ ভাই এলেন। রোকন মামার শ্যালক তো আগে থেকেই সেখানে আছেন। এরই মধ্যে ফারিয়াত তার ফেভারিট ম্যাংগো জুস খেতে খেতে বসার ঘরে এলো। ফারিফতা তখন সেখানে নেই।
সেটা দেখে ফায়েজ ভাই ফারিয়াতকে বললেন, কে এনেছে এই জুস? তাকে থ্যাংকস বলেছ তুমি?
ফারিয়াত তো আসলে জানে না এটা কে এনেছে। তাই ও কিছুই বলতে পারল না।
তখন রোকন মামা বললেন, ওর নানাভাই (মানে ওনার শ্যালক) এনেছে এগুলো।
ফারিয়াত তাই তাকেই থ্যাংকস বলল। আর তিনি মুচকি হেসে বললেন, ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম!
একথা শুনে কামরুল সাহেব হা হয়ে বসে রইলেন। কিছুই বলতে পারলেন না তিনি।
অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য
