ক্ষুদ্র মশা মহাবিপদে ফেলেছে :মুক্তি কীসে?

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:৩৭

ছোট্ট মশার কী দারুণ এক ক্ষমতা! ছোট্ট এডিস মশা গোটা জাতিকে সংকটে নিপতিত করেছে। তারা আমাদেরকে বর্তমানে এক মহাবিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এডিসের ডেনভি-৩-এর দাপটে দেশের মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে দিনাতিপাত করছে। বিসিএসআইআর এক গবেষণা রিপোর্টে বলেছে, ২০১৯-এ ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুর শকে যাওয়ার হার কম ছিল এবং ৫ থেকে ১০ শতাংশ শিশু শকে যেত। ২০২১ সালে এসে শকে চলে যাবার হার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শিশুদের দ্রুত প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে। একদিকে করোনা, বৃষ্টি, বন্যা, নদীভাঙন, অপরদিকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের আহাজারি ও আক্রান্ত প্রতিটি পরিবারে প্রাণপ্রিয় শিশুর মৃত্যুর ভয়। এমন বাজে সংকটের মুহূর্ত আমাদের দেশে দীর্ঘদিন দেখা যায়নি, আঘাতও হানেনি!

ইতিপূর্বে নানা ধরনের মহামারি, যেমন—কলেরা হতো, গুটিবসন্ত দেখা দিত, ঘন ঘন ডায়রিয়া হতো। সেই আতঙ্কের দিনগুলো আমরা পেরিয়ে এসেছি। এছাড়া ভয়ংকর ছয়টি শিশুর রোগকেও আমরা দূরে ঠেলে দিতে সমর্থ হয়েছি। জ্বর, পেটের পীড়া ইত্যাদি আমাদের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে অতি সাধারণ ব্যাপার। এগুলো হলে কেউ সাধারণত মারা যায় না। তাই প্যারাসিটামল বা খাবার স্যালাইন নিজে নিজে সেবন করার রেওয়াজ ঘরে ঘরে সমাদৃত। কয়েক বছর ধরেই এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রবণতা লক্ষণীয় হলেও মৃত্যুহার তেমন না থাকায় সেটাকে একদম অবহেলা করা হয়েছে। যদিও ভারত, থাইল্যান্ড, ফিলিপিনস প্রভৃতি দেশে ডেঙ্গু জ্বরের জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশে মোটেও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। মশার কামড়ে মানুষের মৃত্যু হঠাত্ করে বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি সবার নজর কেড়েছে।

আমাদের দেশে ২০০০ সালে প্রথম শুরু হওয়া ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আমাদেরকে উনিশ বছর সময় দিয়েছিল এডিসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার; কিন্তু তা না করে রাজধানীকে দালানের বস্তি ও ময়লার ভাগাড় বানিয়ে অবহেলায় সময় পার করে দিয়েছি আমরা। তাই তো ২০১৯ সালে এডিসরা মরণকামড় বসিয়ে দেয়। ঘটায় ডেঙ্গুর আক্রমণে সর্বোচ্চ মৃত্যু। তখন শিশু, স্কুলছাত্র, অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী, পুলিশের বড় কর্মকর্তার স্ত্রী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাসহ বহু প্রাণ ডেঙ্গু জ্বরের কারণে ঝরে গেছে। এবারে শুরু করেছে শিশুদেরকে আক্রমণের শিকার করার মাধ্যমে।

ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না—রোমানরা যখন ইউরোপ জয় করে তখন সেখানে জৌলুস ছিল; কিন্তু সৈন্যদের দুর্নীতি, লুটতরাজ, বিলাসিতা, অহমিকা ও কাজকর্মে অনীহা থেকে সামাজিক অনাচার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। মাদকদ্রব্য আফিমের ব্যবহার বেড়ে যায়। কাজকর্মে চরম অবহেলা ও নোংরামির কারণে আবর্জনার স্তূপ জমে ওঠে। চারদিকে ময়লা আবর্জনা ও ভাগাড়ের কারণে ইঁদুরের বংশ ও বসতি বেড়ে যায়। আমদানি বেড়ে যাওয়ায় যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি বাণিজ্যজাহাজ চলাচলের ফলে নাবিকদের বাক্সপ্যাটরা ও পণ্যসামগ্রীর প্যাকেটের মাধ্যমে প্লেগের বাহন কালো ইঁদুর সারা ইউরোপে বংশ বিস্তার করে ফেলে। এরা প্রথমদিকে ফসলের খামারেই থাকত। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী রবার্ট পিলের সময় আইরিশ পটেটো ব্লাইট ও ফ্যামিনের কথা সর্বজনবিদিত। মড়ক লেগে আলুর আবাদ নষ্ট হয়ে গেলে ইউরোপে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ইঁদুররা একসময় ফসলের জমির শস্যদানা শেষ করে ফেললে খাবারের অভাবে মানুষের বসতিতে ঢুকে আক্রমণ শুরু করে। সেখান থেকে প্লেগ ছড়াতে থাকে ও আতঙ্ক শুরু হয়। মহামারি আকারে প্লেগ শুরু হলে শহরের মানুষ দিগিবদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে একসময় শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করেছিল। শহরগুলো তখন ভূতুড়ে অন্ধকার জনপদে রূপান্তরিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ফরাসি বায়োলজিস্ট আলেক্সান্ডার ইয়ারসিন প্লেগের জীবাণু আবিষ্কার করলে এর প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে অবস্থার উন্নতি হয়; কিন্তু সেই সামাজিক ক্ষত এখনো ইতিহাস হয়ে আমাদেরকে উপহাস করে মাত্র।

ডেঙ্গু জ্বরে এ বছর সারা দেশে এ পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে যা খুবই আতঙ্কের বিষয়। সারা দেশে ২৭ হাজার ৪৩৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। প্রশ্ন হলো—এই মহাবিপদের মুক্তি কোথায়? এই মুহূর্তে সরকারি তথ্য সেল খুলে ডেঙ্গু কোন লেভেলে আছে তা বিরতিহীনভাবে সব রেডিও-টিভি ও পত্রিকায় জরুরিভাবে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে হাস্যকর পদক্ষেপ, যেমন—পিচঢালা রাস্তায়, জনসভায় দুপুরের রোদে ফগিং করা হচ্ছে। অথচ এডিসের জন্মস্থান বাসার কাছে জমানো পরিষ্কার পানিতে, চৌবাচ্চায়, ছাদবাগান, ফুলের টবে, নির্মাণাধীন বাড়ির জমানো পানি, পরিত্যক্ত পনির পিপা-ড্রাম, ড্রেন, বাসন, ডাবের খোসা, পলিথিন, বেসিন ইত্যাদিতে। এজন্য সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। শত শত ছাদবাগানে নিয়মিত পরিষ্কার পানি ব্যবহার করা হয় ও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সেগুলো বড় টব, পাত্র, ড্রাগন ফলের জন্য ব্যবহূত টায়ার প্রভৃতিতে জমা থাকে। সেই পরিষ্কার পানিতে এডিসরা ডিম পাড়ে। মা এডিসরা গাছের পাতায় লুকিয়ে থাকে। অপরিচ্ছন্ন ছাদবাগানে দিনের বেলাতেই মানুষকে কামড়ায়। কীটনাশকে এডিস তেমন মরে না।

স্কুলগামী বাচ্চাদের সঙ্গে বাবা-মা ও অভিভাবকরা দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তাই সবার দুঃশ্চিন্তা কমাতে এবং সার্বিক নিরাপত্তার তাগিদে ব্যাপক হারে সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘিঞ্জি এলাকায় স্কুল-কলেজ হলে জানালা বন্ধ করে মশার সঠিক ওষুধ স্প্রে করার ব্যবস্থা করতে হবে। পরিশেষে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ফেলে নিজে নোংরা থেকে মুক্ত থাকি, পরিবেশকে নোংরা হতে না দিই। তাহলে এডিস মশারা লজ্জায় পালিয়ে যাবে।

n লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান