কৃষিতে আরো ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:৩৮

ইত্তেফাক রিপোর্ট

কৃষি খাতের জন্য নতুন করে ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনামূলক পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। করোনা মহামারি থেকে উদ্ভূত চলমান অর্থনৈতিক মন্দা থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে ‘কৃষি খাতে বিশেষ প্রণোদনামূলক পুনঃ অর্থায়ন স্কিম (দ্বিতীয় পর্যায়)’ নামে এ তহবিল গঠন করা হয়।

এই তহবিলের আওতায় ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন কৃষক। গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে সব তপশিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। এর আগে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, যার মধ্যে প্রায় শতভাগ ঋণ বিতরণ হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। নতুন প্যাকেজ থেকে ব্যাংকগুলো ১ শতাংশ সুদে তহবিল পাবে। এর সঙ্গে আরো ৩ শতাংশ বাড়তি নিয়ে তারা ঋণ বিতরণ করতে পারবে। ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ এই ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে ১৮ মাসের মধ্যে। তহবিলের মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত।

ঋণ নেওয়ার জন্য ইচ্ছুক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগের সঙ্গে একটি অংশগ্রহণ চুক্তি করবে। প্রজ্ঞাপন জারির পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে এই চুক্তি করতে হবে। কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা, ঋণ বিতরণের সক্ষমতা ইত্যাদির ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে তহবিল বরাদ্দ করা হবে। অংশগ্রহণকারী ব্যাংক কর্তৃক এই স্কিমের আওতায় সময়ে সময়ে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা পর্যালোচনান্তে বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনবোধে বরাদ্দকৃত তহবিলের পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করবে। কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালার আওতাভুক্ত খাতে বিতরণকৃত ঋণের বর্তমান গ্রহীতাদের মধ্য থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বা গ্রাহককে বিদ্যমান ঋণসুবিধার অতিরিক্ত ২০ শতাংশ  (সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা) পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। ঋণের সর্বোচ্চ পরিমাণ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক যাচাই-বাছাই করে নির্ধারণ করবে।

ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের শস্য বা ফসল চাষের জন্য এককভাবে জামানতবিহীন (শুধু ফসল দায়বন্ধনের বিপরীতে) সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া যাবে। গৃহস্থালি পর্যায়ে গাভি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ খাতে ব্যক্তিগত গ্যারান্টির বিপরীতে ঋণ প্রদানে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শস্য ও ফসল ঋণ ছাড়া অন্যান্য খাতের ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ন্যূনতম জামানত গ্রহণের বিষয়ে ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেবে। এই তহবিলের ঋণ কোনোভাবেই গ্রাহকের পুরোনো ঋণ সমন্বয়ের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। ঋণখেলাপি এই তহবিলের ঋণ নিতে পারবেন না। 

ব্যাংকগুলো এই বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১ শতাংশ সদে পুনঃ অর্থায়ন সুবিধা পাবে। সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ সুদে এই ঋণ বিতরণ করতে হবে। সুদের এই হার নতুন ও পুরোনো সব গ্রাহকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত শস্য ও ফসল খাতের আওতাভুক্ত দানা শস্য, অর্থকরী ফসল, শাক-সবজি, কন্দাল ফসল ফল ও ফুল চাষ, মত্স্য চাষ, পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাত, কৃষি ও সেচ যন্ত্রপাতি, বীজ উত্পাদন খাতসমূহে ঋণ বিতরণ করা যাবে। আমদানি বিকল্প ফসল যথা ডাল, তেলবীজ, মসলাজাতীয় ফসল ও ভুট্টা চাষে গ্রাহক পর্যায়ে ৪ শতাংশ  সুদহারে ঋণ বিতরণের পৃথক স্কিম চালু থাকায় এ খাতে বিশেষ তহবিলের এই ঋণ দেওয়া যাবে না। বরাদ্দকৃত তহবিলের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শস্য ও ফসল খাতে বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যাংকগুলো পুনঃ অর্থায়ন গ্রহণের তারিখ থেকে অনধিক ১৮ মাসের (১২ মাস + গ্রেস পিরিয়ড ৬ মাস) মধ্যে আসল এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত ১ শতাংশ  সুদ পরিশোধ করবে। কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে শস্য বা ফসল খাতে বিতরণকৃত ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ১২ মাস। এছাড়া অন্যান্য খাতে বিতরণকৃত ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ন্যূনতম তিন মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৮ মাস।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ঋণ বিতরণ শুরু করার পর অংশগ্রহণকারী ব্যাংক মাসিক ভিত্তিতে পুনঃ অর্থায়ন দাবি করতে হবে। পুনঃ অর্থায়ন তহবিলের জন্য ব্যাংকগুলোকে প্রকৃত বিতরণ সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র, বিতরণকৃত ঋণের বিবরণী, পরিশোধের প্রতিশ্রুতিপত্র ও লেটার অব কন্টিনিউটি, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বরাবর দাখিল করতে হবে। বিভিন্ন দফায় ব্যাংকের অনুকূলে ছাড়কৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট দফার মেয়াদপূর্তির মধ্যেই সুদসহ আসলের সব অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংককে পরিশোধ করতে হবে। গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণকৃত ঋণ আদায়ের সব দায়-দায়িত্ব ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত থাকবে। ঋণ আদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনাকে সম্পর্কিত করা যাবে না। ঋণের বকেয়া নির্ধারিত তারিখের মধ্যে পরিশোধিত না হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রক্ষিত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব বিকলন করে তা সমন্বয় করা হবে। স্কিমের আওতায় প্রদত্ত ঋণের অর্থ বা এর কোনো অংশের সদ্ব্যবহার না হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সে পরিমাণ অর্থের ওপর নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে সুদ ধার্যপূর্বক এককালীন আদায় করবে। কোনো ব্যাংক সুদ বেশি নিলে নির্ধারিত ৪ শতাংশ ছাড়াও অতিরিক্ত ১ শতাংশ হারে এককালীন আদায় করা হবে। বিতরণকৃত প্রতিটি ঋণের জন্য পৃথক হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে। ঋণ বিতরণের পুঞ্জীভূত বিবরণী বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগে পাক্ষিক ভিত্তিতে (পক্ষ সমাপনান্তে সাত কর্মদিবসের মধ্যে) দাখিল করতে হবে।