গণহারে ঢাকা ত্যাগের ফলে সারা দেশে করোনার বিস্তার ঘটেছে

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:১৮

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৮ মার্চ । এরপর ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ওই ছুটি শুরুর আগে ২৩ থেকে ২৬ মার্চ মানুষের গণহারে ঢাকা ত্যাগ মূলত দেশব্যাপী করোনাভাইরাস বিস্তারের প্রাথমিক কারণ।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), আইসিডিডিআর’বি এবং আইদেশিসহ দেশি-বিদেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণাপত্রে এমন তথ্য উঠে এসেছে। জিনোমিক কনসোর্টিয়ামের আওতায় বিশ্লেষণধর্মী ওই গবেষণাপত্রে করোনার দেশব্যাপী বিস্তার এবং তা প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে লকডাউন এবং জনসাধারণের গতিবিধির ভূমিকা কেমন ছিল তাও তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের এটুআই প্রোপ্রাম থেকে সংগৃহীত ফেসবুক এবং মোবাইল ফোন অপারেটরদের তথ্য অনুযায়ী,  ২৩ মার্চ থেকে ২৬ মার্চের মধ্যে জনসাধারণের ঢাকা ত্যাগ করার প্রাপ্ত ডাটার সাথে সার্স-কোভ-২ জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, ওই সময়ের মধ্যে ঢাকা থেকে বহির্মুখী যাতায়াতই মূলত দেশব্যাপী করোনাভাইরাস দ্রুত বিস্তারের প্রাথমিক কারণ।

চলতি মাসের ৪ তারিখে ‘জিনোমিক্স, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যান্ড মোবাইল ফোন ডেটা এনাবল ম্যাপিং অব সার্স-কভ-২ লিনেজেস টু ইনফর্ম হেলথ পলিসি ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে গবেষণাপত্রটি নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত, দেশব্যাপী বিস্তারে লকডাউনের পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে জনসাধারণের চলাচলের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবি, আইদেশি, বাংলাদেশ সরকারের এটুআই প্রোগ্রাম, যুক্তরাজ্য ভিত্তিক স্যাঙ্গার জিনোমিক ইনস্টিটিউট, হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ এবং ইউনিভার্সিটি অব বাথ-এর বিজ্ঞানীদের যৌথ উদ্যোগে ২০২০ সালের মার্চ মাসে এই গবেষণাটি শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে মার্চ-জুলাই ২০২০ অন্তর্বতীকালে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত ৩৯১টি করোনাভাইরাস এর জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়।

আইইডিসিআর-এর পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন বলেন, আমাদের এই কনসোর্টিয়াম বিভিন্ন সময়ে নীতিনির্ধারকদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে সহায়তা করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকাতে জনসাধারণের চলাচল নিষিদ্ধ করা, পরিবহন এবং যানবাহন চলাচলে সীমাবদ্ধতা আনা, বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন এবং যেসব দেশে উদ্বেগজনক ভেরিয়েন্ট ছিল সেখান থেকে আগত ভ্রমণকারীদের সাধারণ মানুষদের থেকে আলাদা রাখা, সময়মতো লকডাউন সিদ্ধান্ত বা প্রয়োজনবোধে আন্তর্জাতিক চলাচল সীমাবদ্ধ করা।

এই গবেষণাপত্রটির মূল-লেখকদের একজন ডক্টর লরেন কাউলি বলেন, ‘কিভাবে করোনাভাইরাস বাংলাদেশের ছড়িয়ে পড়েছিল, জেনোমিক এবং মবিলিটি ঢাকা থেকে বিভিন্ন ডাটা স্ট্রিম একত্রিত করে আমরা তা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছি। এই গবেষণাটিতে মহামারি প্রতিরোধে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে যা ভবিষ্যতে অন্যান্য মহামারির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।’  যুক্তরাজ্যভিত্তিক ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নিকোলাস থমসন বলেন, ‘বিজ্ঞানীরা যখন জনস্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সাথে যৌথভাবে একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করেন তখন কতটা সাফল্য অর্জন করা যায় এই গবেষণাপত্রটি তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।’

হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর অধ্যাপক ক্যারোলিন বাকি বলেন,  ‘এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, এ ধরনের একটি মিলিত বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে মূল্যবান ভূমিকা রাখতে পারে, যা অন্য কোনো উপায়ে অর্জন করা কঠিন।’

এই গবেষণায় ফেসবুক ডেটা ফর গুড, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি আজিয়াটা লিমিটেড জনসংখ্যা মোবিলিটি তথ্য সরবরাহ করেছে। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সার্স-কোভ -২ নমুনার সিকোয়েন্সিং-এ সহায়তা করেছে।