সভ্যতা : স্ফিংক্স

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৯:৫৭

 

কল্পনা, বাস্তবতা ও বিশ্বাসের আলো-আঁধারিতে ছেয়ে আছে প্রাচীন অনেক নিদর্শন। এমন একটি ঐতিহ্যের ধারক স্ফিংক্স, যা মানুষ ও পশুর সম্মিলিত রূপের প্রতীক। স্ফিংক্স গ্রিক সভ্যতা ও মিশরীয় সভ্যতায় আলাদা আলাদা গুরুত্ব বহন করে। গ্রিকবাসীদের কাছে এটি এক ভয়ংকর দানব আত্না। বিশ্বাসঘাতকতা, হিংস্রতা ও নির্দয়তার প্রতীক। গ্রিক পুরাণ অনুসারে স্ফিংক্সে রয়েছে একজন নারীর মাথা ও সিংহের দেহ এবং ঈগলের মতো দুটি ডানা। সে সহসাই মানুষের সামনে এসে দাঁড়াত আর ছুড়ে দিত কিছু ধাঁধা যা ছিল বেশ অদ্ভুত। তার শর্ত ছিল ধাঁধার উত্তর দিতে না পারলে সে তাদের হত্যা করে রক্ত খাবে। এসব ধাঁধার উত্তর সাধারণ মানুষের পক্ষে দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় নিরুপায় অসহায় মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে সেই অশুভ দুরাত্মা। গ্রিক সভ্যতায় স্ফিংক্সের প্রকাশ ঘটেছে ইডিপাসের পৌরাণিক কাহিনি ও নাটকে।

অন্যদিকে মিশরীয় সভ্যতায় স্ফিংক্স ধরা দেয় সম্পূর্ণ বিপরীত রূপে। এখানে স্ফিংক্স দেবতাস্বরূপ রক্ষাকর্তা। পবিত্রতা ও কল্যাণের প্রতীক। তাকে অভিভাবকের মর্যাদায় পুজো-অর্চনাও করত তত্কালীন জনসমাজ। মিশরীয় পিরামিড ও ধর্মীয় মন্দির এবং নদীর বাঁধের ধারে আশীর্বাদপূর্ণ পাহারাদার রূপে বেশ কিছু স্ফিংক্সের মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল। এই মূর্তিগুলোতে ডানা ছিল না এবং অনেকক্ষেত্রে ছিল পাগড়ি জড়ানো মাথায় সাপের মুকুট।  বিশেষত প্রাচীন রাজবংশের যুগে পিরামিডের সামান্য দূরে চুনাপাথরের পাহাড় কেটে তৈরি করা স্ফিংক্স মূর্তিটি ছিল সর্বাপেক্ষা আশ্চর্যকর। ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তৈরি এই মূর্তিটির দৈর্ঘ্য ২৪১ ফুট এবং প্রস্থ ৬৫ ফুট। মূর্তিটি পূর্ব বিষুবীয় রেখায় সূর্যের মুখ করে দাঁড়ানো ছিল। মিশরীয়দের অনন্য কলাকৌশল রঙের ব্যবহার, দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা ও স্ফটিক পাথরের প্রয়োগে এই মূর্তিকেও জীবন্ত বলে মনে হতো। অর্ধ-মানব মূর্তিটি দেখতে এত বেশি আকর্ষণীয় ছিল যে মিশরীয়রা একে ‘আতঙ্কের জনক’ বলে সম্বোধন করত।

ধারণা করা হয় ফারাও খফ্রের পিরামিড তৈরির সময়ে তাকে স্ফিংক্স রূপে কল্পনা করে মূর্তিটি তৈরি করা হয়েছিল, যদিও খোদাই বিহীন এ মূর্তির কোথাও খফ্রের প্রকাশ নেই। এটি ছিল ফারাওদের আভিজাত্য ও শক্তির প্রতীক। প্রাচীন মিশরের ফারাও যে রাজা সিংহের মতো সাহসী ও দেবতার মতো শক্তিধর ছিল তারই ভাবমূর্তিই ফুটিয়ে তোলা হতো এসব মূর্তিতে। তবে সাম্রাজ্যের যুগে স্ফিংক্স মূর্তি নিয়ে বিরাট এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। এ সময় ভাস্কর্যশিল্পীরা আগের বিমূর্ত মূর্তির বদলে সরাসরি ব্যক্তিকে তুলে ধরেন।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কারণেই ধস নামে স্ফিংক্স মূর্তিতে। অনেকে ধারণা করেন ১৭৯৮ সালে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন মিশর দখল করলে এটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার স্ফিংক্স মূর্তির বিবর্ণ অবস্থার জন্য নাবিক ক্যাভিকলিয়া ও মোহাম্মদ সাইন আল দ্বাহরের ধ্বংসাত্মক আচরণও দায়ী। এরপর আরো অনেক উত্থান-পতনের ফলে মিশরীয় সভ্যতার বিস্ময়কর কীর্তি স্ফিংক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কালের বিবর্তনে এক সময় ধুলো মাটির নিচেও ডুবে যায়। এরপর প্রায় ৩০০০ বছর পর আধুনিক সভ্যতায় প্রচীন এই ঐতিহ্যের সন্ধান পান প্রত্নতত্ত্ববিদরা। এর কিছু ভগ্নাংশ সংরক্ষণ করা হয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। এখনো মিশরীয় সংস্কৃতির বুকে প্রাচীন নিদর্শন হয়ে শোভা পাচ্ছে সেকালের সাক্ষী স্ফিংক্স মূর্তি, যা দেখতে পিরামিডের শহর মিশরে কৌতূহল নিয়ে হাজারো দর্শনার্থী ভিড় জমায়।

রুকাইয়া মিজান মিমি