বিলুপ্তপ্রায় লাইব্রেরি :পাঠ্যবই কি একদিন জাদুঘরে যাবে?

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:০০

হয়তো আর কিছুদিনের অপেক্ষা। তারপর একদিন ষোলকলা পূর্ণ হবে। পাঠ্যবইয়ের স্থান হবে জাদুঘরে। মিশরের মমির পাশে শুয়ে থাকবে ‘গণিত মুকুল’ কিংবা ‘গণিত সহজ পাঠ’। মেধার মন্বন্তরে বেঁচে থাকব আমরা শিগিগরই। আমরা একদিন ভুলেই যাব কত শত বছরের প্রান্ত থেকে যে স্বর নিয়ে এসেছিল, যে আলোকের জন্মসংগীত গান গাইছিল, সেই লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগারকে। ঠিক যেমন করে আজ আমরা ভুলে গেছি ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, শ্লেষ ও হাস্য-কৌতুকে ভরা দেওয়াল-ছড়ার কথা।

উচ্চমাধ্যমিক এক পরীক্ষার্থীর বাবা ফিরছিলেন হাতে মস্ত বাজারের ব্যাগ নিয়ে। ছেলের জন্য মাছ-শাক-সবজি নয়, ব্যাগভর্তি নোটবই। অনলাইন ক্লাসে ছেলে খুব সুবিধা করতে পারেনি, তাই বাবা কিনে নিয়েছেন বাজারচলতি নানা নোটবই। কেবল ছাপানো নোটবইতে কুলোচ্ছে না। সাতসকালেই খুলে গেছে মোড়ের দোকানের জেরক্স সেন্টার। পাশে একজন চেয়ারে বসে টেবিলে রাবার স্ট্যাম্প মেরে দিচ্ছে নোটের পাতায় পাতায়—‘সিউর সাকসেস কোচিং সেন্টার’। খাঁটি নকল আরকি! প্রাইভেট টিউটরদের লিখে দেওয়া উত্তরের এমন চাহিদা—রাত দেড়টায়ও রীতিমতো খুলে রাখতে হয় ফটোকপির দোকান। সব দেখে মনে হয় শিক্ষা তো নয়, যেন ইনস্ট্যান্ট নুডল্স। নিমেষেই প্রস্তুত, নিমেষেই পাশ। এসবের মধ্যে আর যা-ই থাক, পাঠ্যবইয়ের কোনো গন্ধ নেই। শুধু সহায়িকা নোটবইয়ের জয়জয়কার। অন্য পথও খোলা আছে। একটু ঘুরিয়ে প্রশ্ন এলেই ‘সিলেবাসের বাইরে’ বলে ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভ, পরীক্ষা ভণ্ডুল। ‘পাশে আছি’ বলে ছুটে আসে বিখ্যাত ছাত্র সংগঠন। টেস্টে ফেল করলে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ ঘেরাও, দেদার ভাঙচুর, লোকাল পার্টির শাসানি। এসবের ফলাফলেই আজ পাঠ্যবই ১ টাকার কয়েনের মতো অচল। অনেক ছাত্র তো রীতিমতো আরো এক ধাপ এগিয়ে। শুধু একটা ডায়েরি থাকলেই হয়। পাঠ্যপুস্তকের ধার ধারে না। স্কুলব্যাগও অনাত্মীয়। তাদের দোষ দিয়ে আর লাভ কী! বিদ্যার শক্ত ভিত তো শুরুতেই নড়ে গেছে। এখন শিক্ষানীতি মানেই নোট গলানোর নীতি। ছাত্রছাত্রীদের কল্পনাশক্তি, নিজস্ব লিখনশৈলীকে অথর্ব করে রেখেছে শিক্ষাব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় একদিন ক্লাসের ১০০ জনের প্রত্যেকে মাধ্যমিকে বাংলায় ৮০ পেলেও অবাক লাগবে না। কেননা, নোটবইগুলোতে কোনো অভিনবত্ব না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই নম্বরের ব্যবধান কমছে। বাংলা, ইংরেজির মতো বিষয়ে এই পদ্ধতিতে কেউ ১০০তে ১০০ পেলেও অবাক হয় না। বছর বছর সরকারি টাকায় বই কেনা হলেও সেই পথ মাড়ায় না কোনো ছাত্র। ধুলো জমছে বইয়ে, সেই সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের মনেও। মনের ভেতরের কথা প্রকাশের উপায় রাখেনি পরীক্ষাব্যবস্থাও। ‘বাংলা’ যা অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর প্রিয় বিষয়, সেখানেও সুযোগ নেই নিজের ভাব প্রকাশের। এখন কোনো ক্লাসের পরীক্ষাতেই এমন উত্তর লেখা হয় না, যাতে একটা এ-ফোর সাইজের পৃষ্ঠা পুরোপুরিভাবে ভরে উঠতে পারে। এখন শুধু ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ অথবা বড় বেশি দুই লাইন বা চার লাইন।

ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল লাইব্রেরি। স্কুল, কলেজ, পাড়া-মহল্লার ক্লাবে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল লাইব্রেরি। লাইব্রেরিতে বসে দল বেঁধে বই পড়া হতো। কেউ কেউ বই না পড়লেও খবরের কাগজের প্রথম থেকে শেষ পাতা পর্যন্তই পড়ে ফেলত। পাড়া-মহল্লা আর গ্রামের নারী পাঠকদের অবস্থা কেমন ছিল, তা যেন ফুটে উঠেছে আশাপূর্ণা দেবীর লেখায়—‘চৈতন্য লাইব্রেরির সঙ্গে আমার বাল্যস্মৃতি নিবিড়ভাবে জড়িত। আমার মা এই লাইব্রেরি থেকে বরাবর বই আনিয়ে পড়তেন। তখনকার দিনে অবশ্য মেয়েদের পক্ষে নিজে লাইব্রেরিতে গিয়ে বই নির্বাচন করে নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না। ক্যাটালগ থেকে নাম নিয়ে বাড়ির ছেলেদের দিয়ে বই আনিয়ে নেওয়া হতো। মায়ের দৌলতে আমরাও চৈতন্য লাইব্রেরির বইয়ের পাঠিকা ছিলাম।’

আমাদের অনেকের জীবনেই লাইব্রেরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। লাইব্রেরি জ্ঞানচর্চার একটা গণপরিসর তৈরি করেছে, সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত গড়েছে। শৈশবে দেখেছি, গ্রামে গ্রামে ছোট লাইব্রেরিগুলোতে এলাকার বাচ্চাদের জন্য নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা করা হতো। হাতের লেখা প্রতিযোগিতা, অঙ্কন প্রতিযোগিতা। ছোট ছোট বাচ্চাদের সে সময় থেকেই জ্ঞান আর সাংস্কৃতিক চর্চার দিকে ঠেলে দিত। আজ এ সবই ইতিহাস—পরিতাপ আর বেদনার ইতিহাস। অনেক আগের কথা। স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন পরিদর্শক। অষ্টম শ্রেণির পরিদর্শনে প্রশ্ন ছিল— ‘তুমি বড় হয়ে কী হবে?’ উত্তরে মনোগ্রাহী ভঙ্গিতে এক ছাত্র বিষদ আলোচনা করে পরিদর্শককে মুগ্ধ করেছিল। ছাত্রটিকে উত্সাহ দিতে প্রধান শিক্ষক একদিন তাকে নিজের অফিসকক্ষে ডেকে নিয়ে বাইরের জগেক জানার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে কয়েকটি বই পড়তে দিয়েছিলেন। পাঠ্যবই নয়, বিজ্ঞান ও স্বনামধন্য কিছু মানুষের জীবনীবিষয়ক বই। তিনি বলেছিলেন, এসব বই না পড়লে মনের প্রসার বাড়ে না। আমাদের মনের জানালা শিশুকাল থেকে খুলে দেওয়ার জন্য বর্তমানে এমন প্রধান শিক্ষক আছেন কি না, প্রশ্নের দাবি রাখে।

ছোট ছোট সেই লাইব্রেরিগুলো বন্ধ হয়ে গেল এক এক করে আলো নিভে যাওয়ার মতো। আমরা খেয়ালই করলাম না কত ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে! বড় কিছু লাইব্রেরি এখন থাকলেও তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ফোরণে আমাদের হাতের মুঠায় জ্ঞানভান্ডার; বই পড়তে চাইলে ডিজিটাল লাইব্রেরি, ই-বই, পিডিএফ, কিন্ডল কত কিছু! কিন্তু এই তথ্যের অমিতাচারের আড়ালে জ্ঞানচর্চার ধস যে কতটা নেমেছে, তা হয়তো কেউ বুঝতেই পারেনি। বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, পলিটেকনিক কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়—সবগুলোতেই লাইব্রেরির দরজা লাইব্রেরিয়ানদের অভাবে পাঠকের কাছে অনেকটাই বন্ধ হয়ে আছে। স্কুল-কলেজের লাইব্রেরির অবস্থা চটকলের মতো ধুঁকছে সর্বত্র।

ইদানীং রাজনৈতিক দলের দেওয়াললিখন কমে এসেছে। সাম্প্রতিক কালে রাজনৈতিক দলগুলোর ভোট প্রচারে অনেক বেশি জায়গা করে নিয়েছে ডিজিটাল মিডিয়া। কাজে লাগানো হচ্ছে এসএমএস, ফেসবুক, হোয়াটস-অ্যাপ, টুইটার কিংবা টিভি চ্যানেল। বলতে গেলে বিগত তিন-চার দশকের মধ্যেই আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি প্রচারের চালচিত্রে। কিন্তু আগে ভোট এলেই পাড়ায় পাড়ায় পুরোনো বাড়ি, স্কুল কিংবা ক্লাবের দেওয়ালে লেখা শুরু হয়ে যেত ভোটের ছড়া ও কার্টুন। রাজনৈতিক দলের দেওয়াললিখনে স্থান পাওয়া বহু ছড়া তখন মানুষের মুখে মুখে ফিরত। তবে ডিজিটাল মিডিয়ার দৌলতে আজকাল আকর্ষণীয়, মজাদার রাজনৈতিক ছড়ার সুদিন সম্ভবত ফুরিয়ে যেতে বসেছে। এখন প্রচার হয়ে পড়েছে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর। বিভিন্ন দলের তরফ থেকে ভোটারদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এসএমএস কিংবা টেলিফোন। সব দলই আইটি সেল খুলে বসছে; নেতা-নেত্রীরা তাদের ফেসবুক কিংবা টুইটার অ্যাকাউন্টে প্রচার করছেন।

দিনবদলের আওয়াজ আজ সর্বত্র। পরিবর্তনে দোষ নেই, যদি তা ভালো ফল দেয়। কিন্তু পাঠ্যবই হারিয়ে গিয়ে নোটবইয়ের জয়জয়কার জ্ঞানচর্চার জগতে কী ফল আনছে, তা ভেবে দেখার বিষয় বৈকি! লাইব্রেরি বদলে গিয়ে যদি পানশালা হয়ে যায়, তবে জ্ঞানচর্চার জায়গায় তো জ্ঞানহীন মানসিকতার জায়গাই হবে। পুরো দেশটাই যদি তেমন হয়ে যায়, তবে খুব কি বেশিদিন অবশিষ্ট আছে, যেদিন আমাদের দেখতে হবে বুদ্ধি-বিবেক আর জ্ঞানহীন এক নতুন সমাজ? যেখানে অনেক কিছুই থাকবে, শুধু থাকবে না সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ আর জ্ঞানের চর্চা।

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা