প্রতিভাবান মানুষ প্রায়শই জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকেন। যোগ্যতা আর মেধার নৈপুণ্যে অপরিচিত ব্যক্তিও রাতারাতি তারকা বনে যান। সাধারণ মানুষের মনে তাদের জন্য ভালোবাসা জাগে, ভক্ত তৈরি হয়। আজকাল খ্যাতিমান ব্যক্তিদের আমরা সেলিব্রিটি হিসেবে জানি। অভিনয়, খেলাধুলা, বিনোদন কিংবা ধর্ম—যে জগতেরই হোক না কেন তাদের প্রতি মানুষের অঢেল ভালোবাসা ও বিশ্বাস থাকে। পছন্দের তারকার সঙ্গে দেখা করা, ছবি তোলা এবং অটোগ্রাফ নেওয়া ভক্তদের প্রত্যাশা। অসীম ভালোবাসা থেকে তাদেরকে অনুসরণও করেন অনেকে। তারকাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে বিভিন্ন কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান। তারকারা পণ্যের সমর্থনে কথা বললে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা অনেকাংশেই বেড়ে যায়। যাকে বলা হয় সেলিব্রিটি ব্র্যান্ডিং। এটা হচ্ছে কোম্পানিগুলোর বিজনেস স্ট্রাটেজি বা ব্যবসা কৌশল। সেলিব্রিটি ব্র্যান্ডিংয়ের ফলে কোম্পানিগুলো যেমন মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, তেমন সাধারণ মানুষও নতুন নতুন, সহজলভ্য বা আরামদায়ক পণ্য সম্পর্কে জানতে পারে। এটার ইতিবাচক দিক যেমন আছে তেমন নেতিবাচক দিকও রয়েছে। সম্প্রতি, ই-অরেঞ্জ, ই-ভ্যালি, ধামাকা শপিংসহ দেশের কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নিচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনে ছিলেন দেশের কয়েকজন সেলিব্রিটি। সেলিব্রিটিদের হাতে পণ্যের ঝলমলে বিজ্ঞাপন আর লোভনীয় অফার দেখে ভক্তরাও বিশ্বাস করে বিনিয়োগ করেছেন; কিন্তু ভক্তরা ভোক্তা হয়ে সুবিধা ভোগ করতে পারেননি, প্রতারণার শিকার হয়েছেন। হাজারো মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাত্ করে রাতারাতি সম্পদের পাহাড় গড়তে চাচ্ছে কিছু লোক। টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে সেলিব্রিটিদের।
প্রযুক্তি শাসিত বিশ্বের ডিজিটাল ফাঁদে পা দিয়ে হাজারো মানুষের পথে বসার উপক্রম। সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের কোনো মূল্য নেই! দিনের পর দিন কি তারা প্রতারণার শিকারই হবেন? শুধু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানই নয়, অনেক ভোগ্যপণ্যের বেলায়ও এমন ঘটে। এর আগে গুঁড়া দুধ, পানীয়, বিস্কুট ইত্যাদি পণ্যদ্রব্যেও মিলেছে ভেজাল। সেলিব্রিটিদের দ্বারা বিজ্ঞাপন দিয়ে পণ্য তৈরিতে অসদুপায় অবলম্বন করে প্রতিষ্ঠানগুলো। ভোক্তাদের জীবনও পড়ে হুমকিতে। সর্বশেষ, দুর্নীতির অভিযোগে ইহসান গ্রুপের মালিকসহ কয়েক জনকে আটক করেছে প্রশাসন। এই প্রতারক গোষ্ঠী ধর্মীয় লেবাসধারী। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাত্ করেছে। ওয়াজ মাহফিলে ধর্মীয় বক্তাদের মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়েছে। জনৈক বক্তার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ধর্মীয় প্রতিনিধিদের কট্টর সমর্থনের কারণে মানুষ বিশ্বাসী হয়ে বিনিয়োগ করেছেন; কিন্তু শেষে সর্বস্ব হারিয়েছেন। ধর্মীয় প্রতিনিধিদের কথায়ও যদি আস্থা না থাকে তবে মানুষ কোথায় যাবে? এদের কারণে ধর্মীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
প্রশ্ন হতে পারে—প্রতিষ্ঠান প্রতারণা করলে সেলিব্রিটিদের দোষ কী? হ্যাঁ, সেলিব্রিটিদের দোষ নেই। বিনোদন জগত্ বা ধর্মীয় অঙ্গনের সেলিব্রিটিদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসডর বা পরিবারের সদস্য বানায় প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে লাগামহীন প্রতারণা শুরু করে। সেলিব্রিটিরা নিশ্চয়ই ফ্রিতে এই বিজ্ঞাপনে কথা বলেন না। এর জন্য তারা মোটা অঙ্কের সম্মানি কিংবা উপহার পেয়ে থাকেন; কিন্তু যে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে কথা বলা তাদের জন্য মানানসই হবে না। বিজ্ঞাপনের আগে তাদেরকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে : প্রতিষ্ঠান কেমন এবং এর পণ্যের বা সেবার মান কতটুকু। ভুঁইফোঁড়, অস্থায়ী প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে তারা যেন কথা বলেন, যথাযথ সম্মান রেখেই তাদের প্রতি ভক্ত এবং ভোক্তাদের অনুরোধ। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের যেমন প্রতারণার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তেমন সেলিব্রিটিদেরও সম্মানহানি হতে পারে। প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে ভোক্তাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে। আর অসত্ লোকজন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের নামে যদি প্রতারণার দোকান খুলে বসে তবে অনলাইন কেনাকাটার প্রতি মানুষের আস্থা উঠে যাবে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ই- কমার্স খাতও পড়বে হুমকির মুখে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
