বাংলাদেশের প্রথম ফুড ওয়াক

লুকিয়ে থাকা গল্পের খোঁজে...

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:১৫

বাসার গণ্ডির বাইরের খাবারের মধ্যে অনেকেই খুঁজে পান পৃথিবীর সব সুখ! এমন অনেক মানুষ আছে, যাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বসলেই শুনতে হয় হরেকরকম খাবার কিংবা রেস্টুরেন্টের গল্প! এদের মধ্যে অনেকেই খাবারের গল্প বলার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে। বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন তরুণ শখের বসেই ইনস্টাগ্রামে জানান দেন, ভালো ও সুস্বাদু সব খাবারের কথা! শুধু তাই নয়, ফুড ব্লগিংয়ের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, অলিগলিতে ছড়িয়ে ছিটিতে থাকা খাবারের স্বাদই শুধু তুলে ধরছেন না, এর পাশাপাশি তুলে ধরছেন সেই খাবারের পেছনে লুকিয়ে থাকা ঐতিহ্যের কথা।

খাবারের ঐতিহ্যকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গণ্ডির বাইরের মানুষদেরও জানাতে বাংলাদেশের এক দল ইনস্টাগ্রাম ফুড ব্লগার মিলে ২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মত আয়োজন করেছিল ‘ফুড ওয়াক’। এর মানে ‘হেঁটে হেঁটে খাওয়া নয়!’ ফুড ওয়াকের মাধ্যমে একজন কিংবা একদল ব্লগার একটা নির্দিষ্ট এলাকায় হেঁটে হেঁটে সেখানকার খাদ্য সংস্কৃতিকে তুলে ধরে।

প্রায় ৩০ জন ফুড ব্লগারের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই ফুড ওয়াকের প্রথম গন্তব্য ছিল পুরান ঢাকা। শুরু হয় সকাল সাড়ে ৮টায় পুরান ঢাকায় মালিটোলায় অবস্থিত হোটেল আল রাজ্জাক থেকে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হোটেলে ব্লগাররা সকালের নাস্তা সারেন। মূলত খাঁসির গ্লাসি, কাচ্চি, মোরগ পোলাওয়ের জন্য বিখ্যাত এই রেস্টুরেন্ট। তারপরই রওনা দেন নাজিরাবাজারের উদ্দেশ্যে। পুরান ঢাকার বেশিরভাগ জনপ্রিয় খাবারের আঁতুড়ঘর হলো এই এলাকা। যেমন ঐতিহ্যবাহী বিউটির লাচ্ছি অ্যান্ড ফালুদা, হাজীর বিরিয়ানি, আগুন পান, ওয়ান স্টারের মটকা দই, পান্নু টি স্টল ও হানিফ বিরিয়ানি। সবাই একে একে এসব জায়গায় হেঁটে হেঁটে পরিদর্শন করেন। কখনও হাজীর বিরিয়ানি থেকে ২/১টা ‘পাতা বিরিয়ানি’ কিনে সবাই মিলে ভাগাভাগি করে খাচ্ছেন, ছবি তুলছেন। আবার কখনও বিউটি লাচ্চির থেকে কয়েক গ্লাস লাচ্চি আর ফালুদা কিনে তৃঞ্চা মেটাচ্ছেন! কেউ বা আবার ‘আগুন পান’ মুখে নিয়ে ভিডিও করছেন।

পরবর্তী গন্তব্যস্থল ছিল পলাশীর ছাইয়েদ জুস কর্ণার, যা কি-না বুয়েটের জুস কর্ণার হিসেবে বেশ নামকরা। দুপুরের লাঞ্চ সারতে ব্লগাররা চলে যান পুরান ঢাকার আরেক ঐতিহ্যবাহী জায়গা ‘বিউটি বোর্ডিং’। ছোট লোহার গেট পেরুলেই প্রথমে পড়ে ফুলের বাগান। বাগানের মাঝখানে দূর্বাঘাসে মোড়ানো ফাকা জায়গা হয়ে ওঠে আড্ডাস্থল। আড্ডা দেবার পর তারা তাদের লাঞ্চ সেরে নেন বিউটি বোর্ডিংয়ের বেশ নামকরা আইটেম সরষে ইলিশ, ভাত, ডাল আর ভর্তা দিয়ে। খাওয়া শেষে বিউটি বোর্ডিংয়ের একজন পুরোনো কর্মাচারীর কাছ থেকে তারা শোনেন বিউটি বোর্ডিংয়ের দেয়ালে লুকিয়ে থাকা অজানা গল্প। কেউ কেউ আবার রেকর্ড করেন সেই গল্প, কেউ আবার কলমের খোঁচায় ডায়েরিতে টুকে নেন।

গল্পের এক ফাঁকে আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা অহর্নিশ আহমেদ বলেন, ‘আমরা সরাসরি খাবার নিয়ে চর্চা করি। আমাদের উদ্দেশ্য হলো এদেশের খাবারের বৈচিত্র্য শুধু এ দেশের মানুষের সামনেই না, বরং দেশের বাইরের মানুষের কাছে তুলে ধরা। ফুড ওয়াক মূলত একটি উপলক্ষ, যার মাধ্যমে আমরা সব ব্লগার একদিনের জন্য একসাথে হয়ে কোনো একটি এলাকার অলিগলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাবার ও খাবারের সাথের গল্পকে খুঁজি।’

সুরাইয়া হোসাইন বলেন, ‘৪০০ বছরের এই ঢাকার অলিগলিতে গল্পের অভাব নেই। ঢাকায় যত ঐতিহ্যবাহী খাবার আছে তার বেশিরভাগ কিন্তু পুরান ঢাকাতেই তৈরি হয়। বয়স এবং খাবারের বৈচিত্র্য দুই বিবেচনায় পুরান ঢাকা অন্য যেকোনো এলাকা থেকে এগিয়ে। তাহলে ফুড ওয়াক প্রথম জোন হিসেবে এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কি হতে পারে?’

বিউটি বোর্ডিংয়ের পালা শেষ করে চলে যান লালবাগ। শাহী জুস কর্ণারের নাম করা পেস্তা বাদামের জুস দিয়ে শুরু হয় লালবাগ ভ্রমণের অংশ। একে একে এরপর তারা ভোগ করেন মদিনা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের নামকরা কাশ্মিরি হালুয়া, সর মালাই ও জাফরান ভোগ। তাদের এই ফুড ওয়াক ইতি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সন্ধ্যা ৬টায়।