রাহিবুল হাসান রাকিব
অপূর্ব সুন্দর জায়গা সেন্টমার্টিন। নীল পানিতে ঘেরা এক দ্বীপ, সেখানকার মানুষ অসম্ভব ভালো। ইচ্ছে ছিল, ভালো মানুষদের এই আবাসস্থলে বসে ৬৪ জেলা ভ্রমণ নিয়ে লিখবো! কিন্তু কি লিখবো কিছুই ভেবে পাচ্ছি না! তবে সাইকেলে চেপে ৬৪ জেলা ভ্রমণ করা শুধুই ভালোবাসা ও আত্মবিশ্বাস থাকার কারণেই সম্ভব হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে আমার ৬৪ জেলা ভ্রমণ শুরু। এর আগে লালমনিরহাটের আশেপাশের কয়েকটি জেলা ছাড়া অন্য কোথাও ঘুরতেও যাওয়া হয়নি। এমনকি ঢাকাও না। সব জেলাই আমার কাছে নতুন ছিল।
আমার সাইকেল যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর। অনান্য দিনের মতো সাধারণ একটি দিন সেদিন ছিল মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষে হঠাত্ শুনি বাবা অসুস্থ, রংপুর শহরে আসছে ডাক্তার দেখাতে। আস্তে আস্তে তার অসুস্থতার তীব্রতা বেড়ে যায়। এভাবে টানা ৩ মাস বাবার পেছনে সেবা করে ভর্তি হলাম কারমাইকেল কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে। তখন পড়াশোনার বেশি চাপ নেই, তাই ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপে জয়েন করে পোস্ট পড়তাম। এক সময় বিডি সাইক্লিস্টস গ্রুপে জয়েন বিভিন্ন ধরনের অ্যাক্টিভিটি দেখে আমারো ইচ্ছে হয় ভালো একটা সাইকেল কেনার। কিন্তু তখন হাতে টাকা না থাকায় আর পরিবারের কাছে না চাইতে পারায় নিজের সামর্থের সাইকেল অনুসন্ধান করতে থাকলাম। একই পরিকল্পনা ছিল আমার এক বন্ধুরও।
দুই বন্ধু মিলে ২০১৬ সালে সাইকেল কিনে ফেললাম! একই সাইকেল ভেলোস ৩০। কিনেই দুই বন্ধু আশেপাশে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। গ্রুপে ঘুরতে ঘুরতে একদিন দেখলাম সাইক্লিস্ট নিয়াজ মোর্শেদ একটা সাইক্লিং ইভেন্ট খুলেছে। ইভেন্টের নাম ছিল ‘বরিশাল সার্কিট ট্রিপ’। আমার ট্রিপে যাওয়ার জন্য অনেক আগ্রহ জন্মায়। যোগাযোগ করে চলে গেলাম সেই ট্রিপে। বরিশাল বিভাগের ৫টি জেলা বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালী সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ালাম। তখন থেকেই মূলত সাইকেলে চেপে ৬৪ জেলা ঘুরে বেড়ানোর ভূত ছাপে আমার মধ্যে।
এরপর রংপুরের আশেপাশে জেলাগুলো সাইকেলে ঘোরা শুরু করি। এভাবে বেশ কয়েকটি জেলা ঘোরার পর দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে হতে কড়া নাড়ে ২০১৭ সাল। নতুন বছরে দুই জন ট্রিপমেট নিয়ে শুরু করি তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ যাত্রা! এই যাত্রায় পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাংগাইল, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০১৮ সালের শেষদিকে যখন দেখলাম এখনো ৪২ জেলা বাকি তখন পিঠে ৯ কেজি ওজনের ব্যাগ ও হাতে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি বাকি জেলাগুলোর উদ্দেশ্যে। ডিসেম্বরে টিউশন বন্ধ থাকে, তাই সে সময়টাই বেছে নিলাম ভ্রমণের জন্য। এর আগে ৬৪ জেলা যাওয়ার জন্য রেস্টুরেন্টে ৬ মাস ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করে নতুন সাইকেল কিনেছিলাম।
প্রথমদিন সবচেয়ে বেশি সাইকেল চালালাম, রংপুর থেকে হিলি হয়ে জয়পুরহাট। এরপর জয়পুরহাট হয়ে নওগাঁয় রাত্রিযাপন করলাম। এভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, কুষ্টিয়া হয়ে বাকি ৪১ শেষ হয়! আমার শেষ জেলা ছিল বান্দরবান। এ ভ্রমণের সবচেয়ে মজার বিষয় হলো সব জেলার বিখ্যাত খাবার খাওয়া! সব জেলারই বিখ্যাত খাবারের স্বাদ নিতে পেরে নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবানও মনে করছি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের কালাই রুটি, শিবগঞ্জের আদি চমচম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, কুষ্টিয়ার কুলফি মালাই, মেহেরপুরের সাবিত্রী ও রস কদম্ব, রাজবাড়ির ভাদুসাহার মালাইকারি, চাঁদপুরের ওয়ান মিনিটের আইসক্রিম, ময়মনসিংহের মন্ডা, নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখি ইত্যাদি।
শুধু খাওয়াই নয়, চেষ্টা করেছি প্রতিটি জেলার বেশিরভাগ দর্শনীয় স্থান ঘুরে বেড়ানোর! পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার থেকে শুরু করে কুসুম্বা মসজিদ, ছোট সোনা মসজিদ, চামচিকা মসজিদ, পুঠিয়া রাজবাড়ি, উত্তরা গণভবন, মুজিবনগর, ষাটগম্বুজ মসজিদ, ইদ্রাকপুর কেল্লা, পানাম নগর, সোনারগাঁও, মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জয়নুল আবেদীন পার্ক, মুক্তাগাছা জমিদারবাড়ি, মধুপুর জাতীয় উদ্যান, উয়ারী বটেশ্বর, রাঙামাটির ঝুলন্ত ব্রিজ, স্বর্ণ মন্দির, নীলাচলসহ আরো কত জায়গা!
পথে পথে ভ্রমণের বার্তা পৌঁছানোই ছিল আমার উদ্দেশ্য! ভ্রমণ করলে কি উপকারিতা, কেন মানুষ ভ্রমণ করে, এগুলো পথে পথে মানুষকে জানিয়েছি!
ভালোবাসার সাইকেল নিয়ে ৬৪ জেলা ঘুরে বেড়োনোর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল আমি সব জেলার মানুষের বাড়িতে থেকেছি, খেয়েছি এবং তাদের সাথে মিশেছি। নিজের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কথা বলেছি, তাদেরটাও শুনেছি। পথে অনেক মানুষই আমাকে রাতে থাকতে সহযোগিতা করেছে। এই সহযোগিতার জন্যই আমাকে এক রাতও হোটেলে থাকতে হয়নি ও রাতে বাইরে খেতে হয়নি!
