অধর্মের বিরুদ্ধে দুঃসাহসের অঙ্গীকার

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:০৩

স্মৃতিকে ছায়ার মতো পাশে নিয়ে স্মৃতির শহর দিয়ে হাঁটছি। পল্লবিত গাছপালা, রাস্তাঘাট, পুরোনো বাড়ি, অলিগলি, উজান পথে ঠেলছে। এরকম উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটিরও অর্থ কী? বালক বয়সের চেনা মুখ, বন্ধু, সহপাঠীদের খুঁজছি। যেসব মুখ চোখে ভাসছে, তাদের কেউই আমাকে চেনে না, চেনার কথা নয়, কালেভদ্রে আসি, গ্রামের বাড়িতে এক রাত বড়জোর দুরাত কাটিয়ে পালিয়ে যাই। এবার বাধ্য হয়ে টানা ৯ দিন থাকতে হচ্ছে। পারিবারিক কাজে।

প্রিয় শহর পুরোপুরি বদলে গেছে। বদলে যাচ্ছে আসাম টাইপের ঘরবাড়ি। জনবিন্যাস, মানুষের অভ্যাসও। নব রূপকে স্বপ্ন মনে হচ্ছে। কেউ আগের মতো যখন তখন লুঙ্গি পরে না। তরুণীদের পোশাক-আশাকেও দিনবদলের ছোঁয়া। রাস্তাঘাটে কোথাও বোরকাও নজরে পড়ছে না। শালীন সালোয়ার-কামিজ, কুর্দি অথবা শাড়ি পরে সবাই ঘুরছে। অনুশাসনহীন। স্বাধীন। এদের ঠেকায় কে? স্রোত হয়ে ছুটছে। পশ্চিমবঙ্গে, বাংলাদেশের গ্রাম-শহরেও এরকম ছবি বারবার দেখেছি। মেয়েরা আর ক্ষুদ্র নয়, আপন ডানায় ভর করে উড়তে শিখেছে। জগত্ দেখছে। দেখিয়ে দিচ্ছে তাদের বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাসের গন্তব্য।

সেদিন নিজের সঙ্গে বিড়বিড় করতে করতে হাইলাকান্দির হাসপাতাল রোড হয়ে, মিশন রোড পেরিয়ে কালীবাড়ি রোডের মোড় থেকে ঐতিহাসিক হার্বাটগঞ্জ বাজারের সামনে হাজির আমি। স্মৃতিমগ্ন। হাঁটতে হাঁটতে বাটা চৌমাথায়। পাশেই জেলা পরিষদের অফিস। ভিড়ে ঠাসা চত্বর, সামনে গাড়ি, অসংখ্য বাইক। চৌহদ্দিতে ঢু মারতেই চোখে পড়ল, চেয়ারম্যানের নেমপ্লেট, ফরহানা খানম চৌধুরি। প্রশ্ন জাগল, নির্বাচিত শীর্ষাধিকারী মহিলাটি কে? শহরের না গ্রামের বাসিন্দা? পর্দানশিন না ব্যতিক্রম? কৌতূহল বাড়তি উত্সাহ জোগাচ্ছে। ওর বিশেষ সচিবের ঘরে ঢুকে বললাম, চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করতে চাই। প্রবন্ধের মতো ভারী মুখের ভদ্রলোক আমল দিলেন না, উনি মিটিংয়ে ব্যস্ত বলেই এড়িয়ে গেলেন। বসে থাকলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। বাইরের কোলাহলে সূর্যাস্তের ছায়া। ভাবলাম সচিবের ওপর ভরসা করে লাভ নেই। পাশে বসে থাকা অন্য একজনকে বললাম, ভিজিটিং কার্ডটা একটু ভেতরে দিয়ে আসুন। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে মুশকিল আসান হয়ে সাদামাটা পোশাকের মহিলা বেরিয়ে এলেন। পরনে সাধারণ শাড়ি, লম্বা হাতা ব্লাউজ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো মাথায় সাবেকি ঘোমটা। জিগ্যেস করলেন, বিশেষ কোনো কাজ আছে? না তেমন কিছু নেই। আলাপ করতে এসেছি। একজন মহিলা জেলা পরিষদের শীর্ষে, জেনে ভালো লাগছে। শুনে হাসলেন, এই পদে যখন বসে কাজ করি, তখন নারী-পুরুষের তফাতকে গুরুত্ব দিই না। এখানে আমি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। মানুষ আমাকে সুযোগ দিয়েছেন, সে কথা ভুলি না। তিন বছর ধরে দায়িত্ব সামলাচ্ছি। আমার কাজের ধরন আলাদা। বলেই একটু থামলেন। এবার সুযোগ পেয়ে আমার প্রশ্ন, চারপাশের সমাজ রক্ষণশীল। পুরুষের ভূমিকা যেখানে মুখ্য। এরকম পরিস্থিতিতে দায়িত্ব সামলাতে অসুবিধা হয় না? বাধা আসে না? হঠাত্ জ্বলে উঠলেন ফারহানা। এত তেজ, দীপ্তি তার চোখে এতক্ষণ লক্ষ করিনি। বললেন, কীসের বাধা? কে দেবে বাধা? সবাই আমরা পরস্পরের সহযোগী। বাড়িতে, বাড়ির বাইরেও আমার স্বামী মাসুক আহমেদ বড় ভুঁইয়া আমার দিশারি। ছোটবেলা থেকেই আমি বহির্মুখী। অন্তর্মুখী নই। 

আলাপচারিতায় জানা গেল—ফারহানার স্বামী মাসুক আহমেদ সমাজমনস্ক রাজনীতিক। জাতীয় কংগ্রেসের ছাত্রনেতা ছিলেন। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা তাকে তৃণস্তরে নিয়ে এসেছে। দলমতের ঊর্ধ্বে থাকা একটি মানুষ।

ফারহানার বাবা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরি বনবিভাগে চাকরি করতেন। মা মিনারা খাতুন সংসার সামলাতেন। মা-বাবা দুই জনেই প্রকারান্তরে জীবন গড়ার কারিগর। স্কুল জীবনেই খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মে জড়িয়ে পড়েন ফারহানা। বিয়ের পর স্বামীর হাতে গড়া নজরুল যুব পরিষদ তার কর্মশালা হয়ে ওঠে। বুঝতে পারলেন, সংস্কৃতি আর রাজনীতির মধ্যে একটি সেতু আছে। তাকে ব্যবহার করতে হবে। তখনই রাজনীতি হাতছানি দেয়। প্রতিবন্ধকতা ছিল, আড়চোখের ঈর্ষাও ছিল। রক্ষণশীলতাও আটকাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। ভোটে দাঁড়ালেন। বিপুল ভোটে জিতলেন।

ফারহানা থেমে থেমে বলছেন। আমি শুনে যাচ্ছি। মাঝেমধ্যে প্রশ্ন। অপ্রীতিকর হলেও প্রশ্ন এড়িয়ে যাবার ঝোঁক নেই তার। বললাম, ক্ষমতার জন্যই কি রাজনীতির সঙ্গে ওঠাবসা? ‘একদম না।’ ক্ষমতা আসে। ক্ষমতা চলে যায়। বুদ্বুদের মতো তার স্বভাব। আমি বিশ্বাস করি, আগে সমাজের ইচ্ছা পূরণকে গুরুত্ব দিতে হয়। পরে রাজনীতি। অর্থাত্ সবার আগে সমাজ, অনেক পরে রাজনীতি। আমার ধারণা, সত্ রাজনীতি কাজ দাবি করে। এ রাজনীতির রং নেই। দল নেই। কাজের পরিসর খুঁজতে আমরা এদল ওদল করি। দক্ষতা থাকলে যে কোনো দলের সদস্য হয়েও কাজ করা সম্ভব। এই যে, আমাদের জেলা পরিষদের ১১ জন সদস্য, এই যে ৬২টি আঞ্চলিক পঞ্চায়েত ও ৬২টি গ্রাম পঞ্চায়েত আমাদের সঙ্গে যুক্ত। সবার সদিচ্ছা, দাবিদাওয়া মেনেই কাজ করতে হয়।

ফারহানা কথাবার্তায় মুগ্ধতা বাড়ছে। উঠতে ইচ্ছে করছে না। বুঝতে পারছি ব্যস্ততা থেকে ওকে এরকম সরিয়ে রাখা ঠিক হচ্ছে না। কথাবার্তার ইতি টানতে চাইছি; কিন্তু কথার ওপর কথা এসে যোগ দিচ্ছে। ভেতর থেকে প্রশ্ন বেরিয়ে এলো, হাইলাকান্দি প্রান্তিক, গরিব জেলা। কলকারখানা নেই। চাষবাস কমে গেছে। কর্মহীনতা বাড়ছে। সমাজের রক্ষণশীলরা একদিকে, আপনি আরেক দিকে। অস্বস্তি বোধ করেন না।

জ্বলে উঠলেন ফারহানা, কীসের অস্বস্তি? করোনার আবহে নিজেকে বাড়িতে আটকে রাখি নি। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম ছুটতে হয়। মৃত্যুকে হরদম তাড়া করেছি। বিনা মূল্যে মানুষের চিকিত্সা, ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। অর্থ যোগাতে হচ্ছে। বন্যার সময়েও আমরা একইভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াই। যে কোনো উত্সবেও এরকম। লোক দেখানো কাজ নয়, এটা আমাদের দায়িত্ব। এ দায়িত্বে অবহেলা মানেই পাপ। আমি ধর্মমগ্ন মানুষ। আজ যারা কোনো কোনো দেশে অস্ত্র হাঁকিয়ে ভয় চাপিয়ে দিচ্ছে। মেয়েদের যা-তা বলছে, হুমকি দিয়ে মানুষকে উদ্বাস্তু বানিয়ে দিচ্ছে, তাদের বলতে ইচ্ছে করে—সভ্যতার ইতিহাস পড়ো, ইসলামের অতীতকে খোলা চোখে দেখো। তা হলে, বুঝতে পারবে, মহিলাদের শক্তি অশেষ। তারা মায়ের জাত। তারাই প্রকৃতির খাঁটি বন্ধু। অর্ধেক আকাশ নয় তারা, পূর্ণ আকাশেরই অংশ। শুধু সন্তানের জন্ম দেয় না, সন্তানকে মানুষ করে।

রাত নামছে। বাইরের শহরের টিমটিম আলো। ফারহানাকে গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে। শহর থেকে দূরে, রতনপুরে। আমাকে শহর ঘেঁষা লক্ষ্মীরবন্দে। আলো ঝলমল গ্রামে। ফিরতে ফিরতে মনে হলো, আমাদের এই গ্রামেই গত শতকে একজন মহিলা মেয়েদের জন্য স্কুলের পর স্কুল গড়েছেন। প্রথমে বাড়িতে। পরে খালপাড়ে। রক্ষণশীলদের ষড়যন্ত্র স্কুল পুড়িয়েছে। ভষ্ম থেকে আবার উনি স্কুল গড়েছেন। রাতে লণ্ঠন জ্বালিয়ে স্বামী-স্ত্রী বাড়ি বাড়ি ঘুরে মেয়েদের পড়াশুনোর গুরুত্ব বোঝাতেন। ফারহানা আর তার স্বামী মাসুক আহমেদও সম্ভবত ঐ বিগত দম্পতির উত্তরসূরি। তারা দুজনেই প্রকারান্তরে মানুষ গড়ার স্থপতি।

n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা