প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে জিয়াউর রহমান যে জড়িত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি তাকে আসামি করতে চেয়েছিলাম। তখন আমাদের হোম সেক্রেটারি ছিলেন রেজাউল হায়াত। সে আবার বলল, মৃত মানুষকে তো আসামি করা যায় না। আমার মনে হয় এটা ভুল, নামটা থাকা উচিত ছিল।’ গতকাল বৃহস্পতিবার একাদশ সংসদের চতুর্দশ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়ার জড়িত থাকার প্রমাণ হিসেবে খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান, আব্দুর রশিদের সাক্ষাত্কার, সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ও লরেন্স লিফশুজের বইয়ের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাই যদি না করে, তাহলে স্বাধীনতার পর যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছিল, তাদের ছেড়ে দিল কেন? গোলাম আযম তো পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে চলে গিয়েছিল। জিয়াউর রহমান ফেরত নিয়ে আসে।’ দেশে সুশাসন নিয়ে প্রতিনিয়ত বিএনপি নেতাদের সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এত কথা বলেন তারা। আমি মনে করি আমাদের সংসদ সদস্যদের একটা উদ্যোগ নেওয়া উচিত। জিয়ার আমলে প্রত্যেকটা কারাগারে কত মানুষকে ফাঁসি দিয়ে মারা হয়েছে। একেকটা ক্যু, আর শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আর্মি অফিসার, আর্মি সোলজার, বিমান বাহিনীর ৫৬৫ জন অফিসার এবং সোলজার; সব মিলিয়ে এরকম কত মারা হয়েছে। আবার এদের কাছ থেকে মানবাধিকারের কথা শুনতে হয়! এদের কাছে জ্ঞানের কথা শুনতে হয়! এদের কাছে আইনের শাসনের কথা শুনতে হয়!’
জিয়ার শাসনামলে পাকিস্তানিদের দোসরদের মন্ত্রী ও উপদেষ্টা করা, জাতির পিতার খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আর তার বউ খালেদা জিয়া এসে আরো এক ধাপ উপরে গেল যে কর্নেল রশীদ আর হুদাকে এমপি বানিয়ে পার্লামেন্টে বসাল। এই তো তাদের চরিত্র!’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের দলের বেইমান তো ছিলই। খন্দকার মোশতাক-টোশতাক তো ছিলই। এটা তো অস্বীকার করি না। তারা তো একসাথেই ছিল। আর আমাদের বাড়ির ভাত কার পেটে না গেছে। জিয়াউর রহমান তো খালেদা জিয়াকে নিয়ে মাসে একবার করে আমাদের বাসায় গিয়ে বসে থাকত। এখন তো অনেক কিছু হয়ে গেছে।’
জিয়ার আমলের নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, ‘ভোট ধ্বংস করার, ভোটের উপর মানুষের আস্থা-বিশ্বাস নষ্ট করা এটা তো জিয়াউর রহমান শুরু করেছে। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ঋণ শোধ না করার কালচার তার শুরু করা। মানুষকে দুর্নীতিবাজ করা, মেধাবী ছাত্রকে এক হাতে পুরস্কার দিয়েছে, আর আরেক হাতে অস্ত্র, অর্থ দিয়ে তাদেরকে বিপথে পাঠিয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ১৯৮১ সালে ফিরে আসলাম। বলা হলো রাতে ১১টার মধ্যে বাসায় ফিরতে হবে। কেন? কার্ফিউ। কার্ফিউ গণতন্ত্র দিয়েছে, বহুদলীয় না। আর মদ, জুয়া এগুলো তো করেছেই, বলে লাভ নাই।’ জিয়ার কবর নিয়ে তিনি বলেন, ‘জিয়ার মৃত্যু সংবাদের পর তার লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। গায়েবানা জানাজা হয়েছিল। কয়েক দিন পরে একটা বাক্স আনা হলো। এখানে কেউ একটা বুদ্ধি দিয়েছে। আর জেনারেল এরশাদ সাহেব আবার এই ব্যাপারে যথেষ্ট পারদর্শী। সাজিয়ে-গুজিয়ে একখানা বাক্স নিয়ে এসে দেখানো হলো। তখন এই সংসদে বারবার প্রশ্ন এসেছে—যদি লাশ পাওয়া যায় তবে লাশের ছবি থাকবে না কেন?’ বিএনপির প্রয়াত নেতা মীর শওকত আলীকে উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সে বলেছিল—লাশ কোথায় পাব। এরশাদও একই কথা বলেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে বলেছেন—বোন, লাশ পাব কোথায়? আর কী বলব।’
সংসদ নেতা বলেন, ‘মিডিয়াতে কী লিখল আর টক শোতে কী বলল, ওসব নিয়ে আমি দেশ পরিচালনা করি না। আমি দেশ পরিচালনা করি অন্তর থেকে।’ তিনি বলেন, ‘আমার বাবা এই দেশ স্বাধীন করেছেন। এই দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য বছরের পর বছর তিনি জেল খেটেছেন। নিজের জীবনটাকে উত্সর্গ করেছেন। সেই মানুষগুলোর জন্য কী কাজ করতে হবে, যেটা শিখেছি আমার বাবার কাছ থেকে, মায়ের কাছ থেকে, আমি সেটাই কাজে লাগাই। মানুষ তার সুফল পাচ্ছে কি না, সেটা যাচাই করি। কে কী বলল ওটা শুনে হতাশ হওয়া বা উত্সাহিত হওয়া আমার সাজে না, আমি করিও না। এটা হলো বাস্তবতা।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের মানুষের একটা বদ অভ্যাস হয়ে গেছে, কথায় কথায় হতাশ হওয়া। আর যতই কাজ করি তার পরেও বলবে এটা হলো না কেন, ওটা হলো না কেন? আমি একটু বলব; এটা না বলে আগে কী ছিল আর কি আছে সেটা দেখলেই তো হয়ে যায়। সেটা দেখতে পারবে না। কিছু লোক আছে ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’। এই অবস্থায় কিছু লোক ভোগে। আর কিছু লোক আছে হতাশায় ভোগে। সেটা নিয়ে ভাবি না।”
