জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুত্ ঘাটতি মেটাতে ২০১০ সালে দেশে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র (কুইক রেন্টাল) চালানোর বিশেষ আইনের মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়িয়ে সংসদে বিল পাশ হয়েছে। বিরোধী দলের সদস্যদের বিরোধিতার মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার বিলটি পাশ হয়। বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ‘বিদ্যুত্ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (সংশোধন) বিল-২০২১’ সংসদে পাশের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাশ হয়। এর আগে বিলের ওপর দেওয়া জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনীর প্রস্তাবগুলোর ওপর আলোচনা শেষে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তা নিষ্পত্তি করেন।
বিলটি পাশের প্রক্রিয়ার সময় বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা এর বিরোধিতা করেন। তাদের অভিযোগ, জনগণের করের টাকা অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই এই আইন করা হচ্ছে। এর জবাবে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহের জন্যই এ বিলটি আনা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে প্রণীত আইনটির মেয়াদ সর্বশেষ তিন বছর বাড়িয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত করা হয়েছিল। সেই মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদের সম্মতি নিতে বুধবার বিলটি সংসদে তোলেন বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী। ফলে কুইক রেন্টালের মেয়াদ হচ্ছে আপাতত ১৬ বছর।
বিলটি পাশের জন্য তোলার পর এর বিরোধিতা করে বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, আরো পাঁচ বছর কেন বাড়ানো হচ্ছে? আমরা শতভাগ বিদ্যুতের কথা বলছি। রূপপুর, মাতারবাড়ীতে বড় প্রকল্প করছি। ঋণের বোঝা বাড়ছে। এভাবে চললে দেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে। এই আইন করে আমরা অনিয়ম-দুর্নীতির বৈধতা দিচ্ছি। বিশেষ বিধান রাষ্ট্রের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে করা হয়েছে। সন্ত্রাস দমনসহ বিভিন্ন সময় করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষ বিধান কেন ১৬ বছর ধরে চলবে। বিশেষ বিধান সাময়িক সময়ের জন্য করলেন। আজকে কেন আবার পাঁচ বছর? সর্বোচ্চ এই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করেন। এছাড়া ঘোর আপত্তি থাকবে।
গণফোরামের এমপি মোকাব্বির খান বলেন, এই আইন একটি জঘন্য কালো আইন। এখানে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছে। তড়িঘড়ি করে করা হচ্ছে। জনগণের টাকা অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য এই আইন করা হয়েছে।
জাপার মুজিবুল হক চুন্নু নিজের এলাকায় বিদ্যুতের লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এলাকায় বিদ্যুত্ পাই না। চৈত্র, বৈশাখ, ভাদ্র মাসে মানুষ ঘুমাতে পারে না। এলাকায় চার-পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুত্ থাকে না। জোরে বৃষ্টি হলে বিদ্যুত্ যায়। বাতাস হলে বিদ্যুত্ যায়। আমাদের বাঁচান। আইনের এক্সটেনশন দরকার নেই। বিদ্যুত্ দিন। আপনারা বলছেন, ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হয়। অর্ধেক ব্যবহার হয়। সঞ্চালন লাইন নেই। পায়রার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কিনতে পারছেন না সঞ্চালন লাইন নেই বলে। ঐগুলো কেনেন। প্রকল্প বসে আছে। ক্যাপাসিটি চার্জ কত দিয়েছেন? করতেছেন, করেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চার ঘণ্টা বিদ্যুত্ থাকে। আরো কিছু লোকের জন্য এই আইনের দরকার নেই। সঞ্চালন লাইন করেন।
জাপার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, এলাকায় বিদ্যুত্ আসে না যায় বোঝা যায় না। আমাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে। আপনি অল্প জনবল দিয়ে সেবা দিচ্ছেন। একটা লাইন দিয়ে ৬০-৭০ কিলোমিটার লাইন চালাচ্ছেন। আমরা শতভাগ বিদ্যুত্ চাই না। আগের অবস্থায় ফিরতে চাই।
বিএনপির ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। এই আইনে কিছু মানুষের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জনগণের টাকা কিছু মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হবে কিন্তু তা নিয়ে কথা বলা যাবে না। বড় বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো পরিকল্পিতভাবে অচল করা করে রাখা হচ্ছে। জাপার পীর ফজলুর রহমান বলেন, কুইক রেন্টাল ব্যয়বহুল। কেন এটা করা হচ্ছে। সঞ্চালন লাইনে কেন নজর দেওয়া হচ্ছে না।
জবাবে বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, বিলটি নতুন করে আনা হয়নি। সময় বাড়ানো হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ যাতে দিতে পারি সেজন্য এই আইন। ছয় মাসের মধ্যে যাতে কাজ করতে পারি সেজন্য এই আইন। শতভাগ বিদ্যুতায়ন করেছি। এখন নির্ভরযোগ্য বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে চাই। সঞ্চালন লাইন করতে গেলে সময় লাগবে। এটা কুইক রেন্টালের জন্য না। দ্রুত সরবরাহের জন্য এই আইন। আমাদের দ্রুত সঞ্চালন করতে হবে। মাটির নিচে যেতে হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে ঢাকা আন্ডারগ্রাউন্ডে যাবে, সিলেট যাবে, খুলনাও যাবে।
