গোপালপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা
বুনো বাগদী। নাম শুনলেই চোখে ভাসে উদোম গতরের অচ্ছুত মানুষ। মূলধারার জনগোষ্ঠী এখনো যাদের অন্ত্যজ বলে এড়িয়ে চলে। অনটন, দারিদ্র্য, অশিক্ষা এদের নিত্যসঙ্গী। বড় বঞ্চনা—এরা ভাষা উদ্বাস্তু। জানা যায়, দেশের সমতলের ৪৫টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে বাগদীরা। আর বুনোরা মূল বাগদীরই উপগোত্র।
বেসরকারি সংস্থা সেডের জরিপে, দেশে বাগদীর সংখ্যা ১০ হাজার ৮৭৬। কারিতাসের মো. রফির জরিপে ১২ হাজার ৩৯৬। এর এক-তৃতীয়াংশই আবার বুনো। নৃ-তত্ত্ববিদ গ্রাহাম ব্রাউনের মতে, বাগদীরা ওঁরাও জনগোষ্ঠীর অংশ। বাগদী লোকগীতিতে দেখা যায়, ইংরেজরা নীলচাষের জন্য এদেরকে বিহার থেকে বাংলায় আনে। বাগদী পূর্বপুরুষদের তখন প্রলুব্ধ করা হয়েছিল যে, তাদেরকে এমন এক সোনার বাংলায় নেওয়া হচ্ছে যেখানে সবুজ গাছ থেকে নীলচে সোনা হয়। আর সেই কাঁচা সোনা তাদের ভাগ্য বদলে দেবে। তারপর নীলকররা গেছে। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হয়েছে। চলে গেছে স্বাধীন বাংলাদেশেরও ৫০ বছর। কিন্তু বাগদীরা অবহেলিত, অচ্ছুত্ আর ভূমিহীনই রয়ে গেছে। খাসজমি থেকে বাস্তুচ্যুতি যেন তাদের নিয়তি।
গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল গ্রামের অশীতিপর আরতী বাগদী জানান, সাতচল্লিশ ও একাত্তরে বাগদীরা দেশছাড়া হয়। এরশাদ আমলে তাদের খাসজমির ঘরবাড়ি পুড়িয়ে উচ্ছেদ করা হয়। ক্ষতিগ্রস্তরা এখনো বাজারের খাসজমির বস্তিতে গাদাগাদি করে বাস করেন। তার আক্ষেপ, দুর্বিসহ বাগদী জীবনের যেন অবসান নেই। গোপালপুর পৌরশহরের নন্দনপুর বাগদী বস্তির প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে স্বাস্থ্যহানির শিকার শিশুরা। হেমনগর ও ভেঙ্গুলার বাগদীরা দুই বার উচ্ছেদ হয়।
অনিল বাগদী জানান, ১০ বছর আগে ভেঙ্গুলার খাস জমিতে ২৪ বাগদী পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে গবাদি পশু দেওয়া হয়। নির্মিত হয় আধাপাকা দুটি কাউশেড। কিন্তু পশুসম্পদ বিভাগ ফলোআপ না থাকায় মড়কে মারা যায় সব কয়টি গবাদি পশু। পাড়ায় লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গৃহহীন ১০ বুনো পরিবার এখন ঐ কাউশেডে বাস করে।
ভেঙ্গুলার নিমাই বাগদী জানান, অনটনে অধিকাংশ বাগদী শিশু স্কুল বিমুখ। সামাজিক বৈষম্যের শিকার। উপবৃত্তিও সবাই পায় না। প্রশান্ত বাগদী জানান, অনেকের কাছেই তারা অচ্ছুত্। সম্বোধনে তুইতোকারি করে। কোনো কোনো হোটেল-রেস্তোরাঁয় মুচি ও বাগদীর জন্য কাপপিরিচ, থালবাসন আলাদা। সরকারি চাকরি ও সুযোগসুবিধা থেকেও অনেক সময় বঞ্চিত তারা।
বাগদী নেতা ভজনচন্দ্র জানান, প্রজনন স্বাস্থ্য ও জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাগদীদের ধারণা কম। তারা প্রসূতিভাতা পায় না। স্বাস্থ্যকর্মীরা সহজে বাগদী পল্লিতে পা মাড়ায় না। আশ্রয়ণ প্রকল্পে বাগদীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি। গোপালপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইউনুস ইসলাম তালুকদার জানান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বাগদীদের সরকার ক্রমান্বয়ে পুনর্বাসন করছে। ভেঙ্গুলার ছন্নছাড়া বাগদীদের ঝিনাই তীরের খাসজমিতে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে গবাদি পশু দেওয়া হয়। ফলোআপের অভাবে এই প্রকল্প হয়তো সফল হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজ মল্লিক জানান, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঘর দেওয়া হচ্ছে। ১০ পরিবার ইতিমধ্যে ঘর পেয়েছেন। বাকিরাও পর্যায়ক্রমে পাবেন। কেউ গৃহহীন থাকবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্য প্রতি বছর তাদের অনুদান দেওয়া হয়। উচ্ছেদ নয় পুনর্বাসন হচ্ছে।
