প্রতিবাদের নানারকম ভাষা রহিয়াছে। সারা বিশ্বেই। সরকারের বা কোনো ব্যক্তির গৃহীত কোনো কাজে দ্বিমত প্রকাশ করিতে গিয়া কখনো প্রতিবাদ রূপ নেয় সহিংসতায়। কখনো অনশন পালন করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয় মৌন মিছিল। করা হয় অবস্থান ধর্মঘট, অর্থাত্ একটি স্থানে বসিয়া পড়া। আবার শৃঙ্খলিতভাবে ব্যানার লইয়াও দাঁড়াইয়া থাকিতেও দেখা যায়। এমনকি কখনো কখনো কাফনের কাপড় পরিধান করিয়া প্রতিবাদ জানানো হয়, যাহার অর্থ হইল সিদ্ধান্তটি পরিবর্তনে প্রয়োজনে জীবন দিতে প্রস্তুত। প্রত্যেক ধরনের প্রতিবাদেরই উদ্দেশ্য থাকে। তাহার মধ্যে প্রধান উদ্দেশ্য হইল, জনমত গঠন এবং সরকারকে বা যে বিষয়ে বা যাহার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তাহাকে সিদ্ধান্ত হইতে সরিয়া আসিতে বাধ্য করার চেষ্টা। ইহা ছাড়া আরো বিনম্র প্রতিবাদও দেখা যায়। যেমন ছবি আঁকিয়া প্রতিবাদ, গ্রাফিটি আঁকিয়া কিংবা গণসংগীত, দেশাত্মবোধক অথবা সুনির্দিষ্ট কোনো গান পরিবেশন করিয়া প্রতিবাদ, পাহাড় বা উঁচু ভবনে উঠিয়া প্রতিবাদ। কিন্তু বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র একটি অভিনব প্রতিবাদ করিয়াছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত একটি পুরাতন কৃষ্ণচূড়া গাছ কাটিয়া ফেলিবার কারণে তাহারা কাটিয়া ফেলার গাছের একটি গুঁড়িকে সাদা কাপড়ে মুড়াইয়া মিছিল করে। অর্থাত্ তাহারা ইহাকে বৃক্ষ হত্যা বলিয়া বিবেচনা করে। সেই সঙ্গে ঐ গাছটি যেইখানে ছিল তাহার পার্শ্বের একটি নূতন কৃষ্ণচূড়ার চারা লাগাইয়া দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ক্যাম্পাসে আরো ১০০টি গাছ লাগাইবার দাবি জানায়। অযৌক্তিক বলা যাইবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই ঘনবসতিপূর্ণ এবং মারাত্মক দূষণের শিকার মহানগরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। চারিদিকের বাতাসে যখন বিষাক্ত গ্যাস ও ধূলিকণার আধিক্য, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সজীব চিত্তের শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেনের পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে এই গাছের সঙ্গে তাহাদের আবেগও জড়াইয়া আছে। তাহারা বলিয়াছে, ‘এই গাছগুলি কাটিয়া ফেলা মানে ইতিহাসকে কাটিয়া ফেলা। আমরা ইতিহাসকে বহন করিতে চাই।’
অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানাইয়াছেন, গাছটির গোড়া ক্ষয় হইয়া একদিকে হেলিয়া পড়িয়াছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয় আরবরি কালচার সেন্টারের পরিচালকের নেতৃত্বে একটি কমিটি পর্যবেক্ষণ করিয়া ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলিয়া সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে উহা কাটিয়া ফেলা হইয়াছে। আমরা জানি, কখনো কখনো কর্তৃপক্ষের উপায় থাকে না সকলের অমতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে হয়। সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ হইলে তাহা কাটিয়া ফেলাই শ্রেয়। কিন্তু সবুজ মনের শিক্ষার্থীদের একটি বৃক্ষের পরিবর্তে ১০০ চারা লাগাইবার দাবিটিও অত্যন্ত যৌক্তিক। এমনিতেই ঢাকা ও তাহার আশপাশের বৃক্ষের সংখ্যা ক্রমেই কমিয়া যাইতেছে। তাহার ওপর ঘনবসতি, ঢাকার আশপাশের মিল কারখানা, শহরের ভেতর চলা লাখ লাখ যানবাহন পরিবেশকে দুর্বিষহ করিয়া তুলিয়াছে। শহরের ফাঁকা জায়গা, মাঠ, সবুজ বৃক্ষের সারি প্রায় নাই হইয়া গিয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে যে খানিকটা জায়গা রহিয়াছে, তাহা বৃক্ষ দ্বারা সুশোভিত করিয়া তোলা উচিত ছিল আরো পূর্বেই। কিন্তু তাহা হইয়া উঠে নাই। বরং আশপাশের পার্কগুলিও এখন নানা ধরনের হুমকির সম্মুখীন। সুতরাং শিক্ষার্থীদের এই অহিংস অভিনব প্রতিবাদের দিকে কর্ণপাত করিতে হইবে। যেই সংগঠনই এই প্রতিবাদ করিয়া থাকুক না কেন, ইহা কোনো রাজনৈতিক প্রতিবাদ নহে, ইহা ঐতিহ্য রক্ষা, পরিবেশ রক্ষাবিষয়ক একটি প্রতিবাদ, যাহার সঙ্গে গোটা জাতির সুদূরপ্রসারী স্বার্থ জড়াইয়া আছে। বিশ্ববিদ্যালয় যাহারা পরিচালনা করেন তাহারা শুধু উচ্চশিক্ষিতই নহেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের বুদ্ধিমত্তার প্রতীক। তাহারা অনেক কিছুই ভালো জানেন, ভালো বুঝেন। কিন্তু কখনো কখনো কোনো কোনো সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ে সঠিকভাবে গ্রহণে ঘাটতি হইতে পারে যে কাহারোই। আমরা শুধু সেই কথাটিই স্মরণ করাইয়া দিতে পারি।
