দুই ট্রাস্টি বোর্ডের দ্বন্দ্বের মাশুল দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:০৭

 ‘প্রতিষ্ঠাতা’ পদবি ও মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের রশি টানাটানিসহ নানা অনিয়মের কারণে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (সিবিআইইউ) কয়েক সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পাশ করে বের হয়েও উচ্চশিক্ষা কিংবা চাকরির সুযোগ না পেয়ে পথে পথে ঘুরছেন সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। বছর দেড়েক ধরে এ অচলাবস্থা চলছে। তবে করোনার কারণে সবকিছু এত দিন আড়ালেই ছিল। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার তোড়জোড় হওয়ার পরই পর্যটন নগরীর সর্বোচ্চ এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অচলাবস্থা ও রশি টানাটানির বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে।

শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে রাষ্ট্রপতি নিয়োগকৃত উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা। ২০ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে স্টুডেন্ট ফোরামের ব্যানারে ফুঁসে উঠেছেন তারা। আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীরা সব ধরনের ফি বন্ধ রাখার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি ও মানববন্ধন করেন। সমস্যা সমাধানে গত ১৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেন তারা।

স্টুডেন্ট ফোরামের মুখপাত্র হোসাইন মুরাদ প্রিন্স বলেন, আমাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই, উপাচার্য নেই। পাশ করে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন না অস্থায়ী প্রত্যয়নপত্রও। এতে এ বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা শেষ করে বের হওয়া সহস্রাধিক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা কিংবা চাকরির সুযোগ না পেয়ে পথে পথে ঘুরছেন। আমরা ইউনিভার্সিটির নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু কোনো সুষ্ঠু সমাধান পাইনি। আমাদের প্রথম দাবি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগকৃত ভিসি।

বিশ্ববিদ্যালয়টি উদ্বোধন হয় ২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থী পাশ করে বের হয়েছেন। বর্তমানে ৮০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। ইউনির্ভার্সিটিতে বর্তমানে আইন, ইংরেজি, বিবিএ, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল, হসপিটালিটি অ্যান্ড টুরিজম ম্যানেজমেন্ট, লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স এবং ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদে পড়ানো হচ্ছে। তবে বিবিএ ও আইন অনুষদে বিভাগীয় প্রধানসহ কয়েকজন শিক্ষক থাকলেও অন্যান্য অনুষদে ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান দিয়ে চলছে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইউনিভার্সিটি মানেনি ইউজিসির কোনো নির্দেশনা। আট বছরে হয়নি স্থায়ী ক্যাম্পাস, মেলেনি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগকৃত উপাচার্য। হয়নি কোনো সমাবর্তন। শুধু আশার বাণীতে প্রতি বছর ভর্তি করা হয়েছে নতুন শিক্ষার্থী। এদিকে প্রতিষ্ঠার পর  থেকে ইউজিসি কয়েক দফা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে নানা নির্দেশনা দিলেও সেগুলো মানেনি কর্তৃপক্ষ।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অস্থায়ী ক্যাম্পাসের চুক্তি শেষে ভবনটির তৃতীয় ও চতুর্থ তলা ছেড়ে দিতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। এর পরের বছরের শুরুতেই বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। একই বছরের মে মাসের মধ্যভাগ থেকে ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। এরপর একে একে বের হতে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নানা দুর্নীতি। শুরু হয় মূল উদ্যোক্তার দাবি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ। কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনার জন্য একটি ট্রাস্টি বোর্ড থাকার আইন থাকলেও এখানে রয়েছে দুটি ট্রাস্টি বোর্ড। দুই পক্ষের সদস্যরাই নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল উদ্যোক্তা ও ট্রাস্টি বলে দাবি করছেন।

ইউজিসির নথিপত্র যাছাই করে দেখা যায়, ২০১৩ সালে ১০ সদস্যবিশিষ্ট কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ট্রাস্টের (বিওটি) অনুকূলে ‘কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’ অনুমোদন দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। আর সেক্রেটারি ছিলেন লায়ন মো. মুজিবুর রহমান। বাকি আট সদস্যের মধ্যে রয়েছেন সেক্রেটারির স্ত্রী, ভাই, ভাতিজা ও শ্যালকসহ নিকটাত্মীয় ও চেয়ারম্যানের স্ত্রী-পুত্র। এজন্য মূলত ট্রাস্টির চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আহমদ ও সেক্রেটারি লায়ন  মুজিবের নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হতো সিবিআইইউ।

আধিপত্যকে কেন্দ্র করে ২০২০ সালে ট্রাস্টির চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আহমদ ও সেক্রেটারি লায়ন মুজিবুর রহমানের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়। দ্বন্দ্বের জেরে গত বছর বিওটির এক সভায় সালাহউদ্দিন আহমদকে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদের স্ত্রী ও ছেলেকেও ট্রাস্ট থেকে বের করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে সালাহউদ্দিন আহমদ সেক্রেটারি লায়ন মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান ও প্রতিষ্ঠাকালীন সব সদস্যকে বাদ দিয়ে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানসহ তার আস্থাভাজনদের নিয়ে নতুন একটি ট্রাস্ট গঠন করেছেন। সেই বিওটিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান দুটিই দাবি করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। বর্তমানে দুটি ট্রাস্ট আলাদাভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সূত্রমতে, চলতি বছরের জুন মাসে একাডেমিক, আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের কারণে এক বছরের জন্য শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখার সুপারিশ করে ইউজিসি।

এছাড়া ইউজিসির একটি পরিদর্শক দল প্রতিবেদনে জানায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বৈধ কোনো উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নেই। যারা পাঠদান করেন, তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভাড়া করা ভবনে চলে কার্যক্রম। সেখানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অনুকূল কোনো পরিবেশ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিকল্পিত প্রতারণা করেছে। নেই অনুমোদিত কোনো সিলেবাস। এছাড়া ইউজিসির অনুমোদন ছাড়াই চলছে সান্ধ্যকালীন ব্যাচ।

প্রতিষ্ঠাকালীন ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সচিব লায়ন মো. মুজিবর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা সবকিছু সুচারুভাবে পরিচালনা করেছি বলেই কোনো ধরনের অভিযোগ ওঠেনি। ‘প্রতিষ্ঠাতা’ পদ দাবি করে বিওটির সাবেক চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আহমদ ব্যর্থ হয়ে নির্লজ্জভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি দখল করে মামলাসহ নানা অপকাণ্ড চালাচ্ছেন। সালাহউদ্দিন আহমদ সিআইপি বলেন, আগে কোনো কিছুই নিয়ম মতো চলেনি, আমরা ভার্সিটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর এখন সবকিছু গুছিয়ে আনা হচ্ছে। সামনের দিনে সবকিছু নিয়মমতো হবে।