সারা দেশে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে আলোচিত ইভ্যালির ব্যাবসায়িক অপকৌশল ছিল নতুন গ্রাহকের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়ে পুরাতন গ্রাহক ও সরবরাহকারীর দায়ের আংশিক পরিশোধ করা। এভাবে দায় ট্রান্সফারের মাধ্যমে দুরভিসন্ধিমূলক অপকৌশল চালিয়ে যাচ্ছিল ইভ্যালি। প্রতিষ্ঠানটির নেওয়ার্কে যত গ্রাহক তৈরি হতো, দায় তত বৃদ্ধি পেত। ইভ্যালির গ্রেফতারকৃত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল জেনে-শুনে এই নেতিবাচক স্ট্র্যাটিজি গ্রহণ করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। গতকাল রাসেল ও তার স্ত্রী ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা অর্থ আত্মসাতের মামলায় প্রত্যেকের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলাম। গুলশান থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওহিদুল ইসলাম আসামিদের আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের ১০ দিন করে রিমান্ডের জন্য আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামিদের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গতকাল শুক্রবার র্যাব সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরেন র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, একটি প্রতিবেদনে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইভ্যালির দেনা ৪০৩ কোটি টাকা বলা হলেও সিইও রাসেল ও চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তাদের মোট দায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। গ্রাহকদের এই দায় মেটাতে ব্যর্থ হলে রাসেল ‘কোম্পানি দেউলিয়া ঘোষণার’ পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক তৈরি করে ইভ্যালির ‘ব্র্যান্ডভ্যালু’ বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিল রাসেলের। সেই ব্র্যান্ডভ্যালু কাজে লাগিয়ে তিনি কোনো বিদেশি কোম্পানির কাছে দায়সহ ব্যবসা বিক্রি করে দেওয়ারও কথা ভাবছিলেন। আবার তিন বছর পূর্ণ হলে শেয়ার মার্কেটে অন্তর্ভুক্ত হয়ে দায় চাপানোরও পরিকল্পনা ছিল তার। সেই সঙ্গে ইভ্যালিকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর রাসেল কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বা দেশীয় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়সহ বিক্রি করে দেওয়ার একটি পরিকল্পনা করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে তিনি দায় মেটানোর অজুহাতে সময় নেন, যা তার একটি অপকৌশল মাত্র।
র্যাবের ভাষ্য, রাসেল পরিকল্পিতভাবে এই ব্যবসা করে আসছিলেন। এই ব্যবসাটি একটি পরিবার নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্রে কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। তাছাড়াও প্রতিষ্ঠানে ছিল না কোনো জবাবদিহিতা। ফলে ক্রমান্নয়ে প্রতিষ্ঠানটির দায় বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বর্তমানে এই অচলাবস্থা সৃষ্টি। বিশেষ করে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে যাত্রা শুরুর মাত্র আড়াই বছরে এই বিপুল টাকা কোথায় গেল, তার হদিস এখনো মেলেনি। আত্মসাত্ ও পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত জুলাই মাসে দুদকের আবেদনে ইভ্যালির শীর্ষ কর্তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদালত। তাদের নেতিবাচক ব্যবসায়ী ‘স্ট্র্যাটিজি’ উন্মোচিত হওয়ায় অনেক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং গেটওয়ে প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি থেকে সরে যায়।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন আরো বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থের তেমন কোনো হদিস মিলছে না। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইভ্যালির সম্পদ ছিল ৬৫ কোটি টাকা। অথচ নানা পণ্য বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম নেওয়া হয়েছে ২১৪ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত গ্রাহক ও অন্যান্য কোম্পানির কাছে প্রতিষ্ঠানটির বকেয়া আছে ১৯০ কোটি টাকা। তবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা হলেও ইভ্যালির অ্যাকাউন্টে বর্তমানে ৩০ লাখ টাকা আছে বলে জানিয়েছেন রাসেল। এছাড়া তার প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি যানবাহন রয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ে সাভারে রাসেলের কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জায়গা-জমিসহ অন্যান্য সম্পদ রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, কোম্পানির শুরুর দিকে প্রায় ২ হাজার স্টাফ ও অস্থায়ী ভিত্তিতে ১ হাজার ৭০০ কর্মচারী কর্মরত ছিল। এখন তা কমে ১ হাজার ৩০০ স্টাফ এবং ৫০০ অস্থায়ী কর্মচারীতে নেমে এসেছে। বেতন বাবদ ইভ্যালির খরচ পূর্বে ৫ কোটি টাকা থাকলেও এখন তা দেড় কোটিতে নেমে আসে। গত জুন থেকে অনেকের বেতন বকেয়া আছে।
রাসেলের বরাত দিয়ে র্যাব কর্মকর্তা মঈন বলেন, মানুষের কাছ থেকে যেভাবে অগ্রিম অর্থ বা পণ্য নিয়েছেন তা ফিরিয়ে দেওয়া জটিল বলে রাসেল স্পষ্ট ভাষায় র্যাবের কাছে স্বীকার করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকরা যখন প্রতারিত হচ্ছিলেন, পণ্য পাচ্ছিলেন না, তখন হঠাত্ করে ‘টি টেন’ ‘টি সেভেন’ ‘টি ফাইভ’ নামে অফার ঘোষণা করে ইভ্যালি। এসব অফারের মাধ্যমে আসলে সাধারণ পণ্য দেওয়া হতো। গত ফেব্রুয়ারির পর বড় কোনো পণ্যা গ্রাহককে তারা দিতে পারেননি।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে র্যাব কর্মকর্তা মঈন বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যেসব কোম্পানি ই- কমার্সে বিনিয়োগ করে, ইভ্যালিতে তাদের বিনিয়োগ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল রাসেলের। সেজন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। গ্রাহকদের সংখ্যা দেখিয়ে ইভ্যালিতে বিনিয়োগ করতে তাদের প্রলুব্ধ করতে চেয়েছিলেন। দেশি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে উত্সাহিতও হয়েছিল। কিন্তু তারা পরে দেখে, ইভ্যালির যে পরিমাণ দায়, সেখান থেকে উত্তরণ বেশ কষ্টসাধ্য।
আদালতের সামনে বিক্ষোভ: শুনানি শেষে রাসেল ও তার স্ত্রীকে আদালত থেকে নিচে নামানোর পর ২০ থেকে ২৫ জন যুবক তাদের মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় কোতোয়ালি থানা পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং সেখান থেকে আসাদ নামে এক জনকে আটক করে পুলিশ।
যেভাবে ইভ্যালিতে রাসেল: রাসেল ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করতেন। পরে তিনি একটি ব্যাংকে চাকরি নেন। ২০১৭ সালে চাকরি ছেড়ে ডায়াপারের ব্যবসা শুরু করেন। ঐ ব্যবসা বিক্রি করে তিনি ১ কোটি টাকা পান। এই সামান্য টাকা দিয়ে ইভ্যালির কার্যক্রম চালু করেন। প্রতিষ্ঠার পর দুই মাসের আগাম সময় নিয়ে প্রায় অর্ধেক মূল্যে পণ্য সরবরাহের বিভিন্ন ‘অফার’ দেওয়া শুরু করে ইভ্যালি। তাতে অল্প সময়ের মধ্যে সারা দেশে মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, এসি, প্রাইভেটকারসহ নানা পণ্যের ক্রেতাদের সমারোহ ঘটতো ইভ্যালিতে। স্বল্প মূল্যের এসব পণ্যের জন্য অগ্রিম টাকা নেওয়া হতো। কিছু ক্রেতাকে পণ্য দিয়ে বাকিদের অপেক্ষায় রাখার কৌশলে তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল। এখন এ কোম্পানির দায় বেড়েছে সম্পদের কয়েকগুণ বেশি।
মাসে ১০ লাখ টাকা নিতেন রাসেল দম্পতি: ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাসেল ও চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন পদাধিকারবলে মাসিক ৫ লাখ টাকা করে বেতন নিতেন। গত জুন মাস থেকে এ পর্যন্ত অনেক কর্মচারীকেই বেতন প্রদানে সক্ষম না হলেও পদাধিকার বলে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা বেতন গ্রহণ করতেন তারা। এছাড়া কোম্পানির অর্থে রেঞ্জ রোভার ও ওডি কোম্পানির দুটি দামি গাড়িও ব্যবহার করেতেন এই দম্পতি। সাভারে রাসেলের কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। ইভ্যালিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ‘ওয়ান ম্যান শো’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত করানোর লক্ষ্য ছিল রাসেলের, এজন্য তিনি বিভিন্ন স্থানে স্পন্সর করেছেন।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের স্যার সৈয়দ রোডের বাসা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাদের র্যাব সদর দপ্তরে নেওয়া হয়। গতকাল শুক্রবার গুলশান পুলিশের কাছে তাদের হস্তান্তর করে র্যাব। এর আগে গত বুধবার রাতে আরিফ বাকের নামের এক ব্যক্তি গুলশান থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। বৃহস্পতিবার ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর হাকিম মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান নুরের আদালত মামলার এজাহার গ্রহণ করে আগামী ২১ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেন।
