বৃষ্টিপাত ও উজানী ঢল কমেছে। বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। ছোট-বড় সব নদনদীর পানি নেমে যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের বড় নদনদীর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, বাঙালী, করতোয়া নদীর পানিপ্রবাহ এখন স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে জেগে উঠছে প্লাবনভূমি। জেগে উঠছে নদী তীরবর্তী বিধ্বস্ত ফসলি জমি। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে আবাদের ক্ষয়ক্ষতি। চলতি বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষি ও কৃষকের। রোপা আমন, বোনা আমন, আমনের বীজতলা, আগাম শীতকালীন সবজি, কলা ও আখসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে বেশি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো. আসাদুল্লাহ ইত্তেফাককে জানান, এ বছর ২১টি জেলা কমবেশি বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। তবে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি নয়। ২১ জেলায় ৬৬ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন, শাকসবজিসহ অন্যান্য ফসল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছিল। এসব নিচু জায়গা থেকে ইতিমধ্যে পানি সরে গেছে। নতুন করে চাষাবাদ শুরু হয়েছে। দেশের ৫৫ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ টন চাল উত্পাদনের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ৯০ শতাংশ জমিতে রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। আর বন্যা না হলে বাম্পার ফলন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
কৃষিবিদ মো. আসাদুল্লাহ বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কুড়িগ্রাম ও জামালপুরে। অন্যান্য জেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি নয়। নিচু এলাকার পনি সরে যাওয়ায় কৃষকরা নতুন করে চাষাবাদ শুরু করেছেন। আবারও ধানের চারা লাগাচ্ছেন চরাঞ্চলের কৃষকরা। প্রস্তুত করছেন জমি। তৈরি করা হচ্ছে বীজতলা। অনেকে আবার আগাম জাতের সবজি চাষ করছেন। বলা যায় বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নতুন আশা ও উদ্দীপনায় কৃষকরা চাষাবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ বছর বন্যায় বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কুড়িগ্রাম জেলায়। প্রায় তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বন্যার পানিতে নিমজ্জিত থেকে রোপা আমন, শাকসবজি নষ্ট হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষক। বন্যায় জেলার ৯টি উপজেলার প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার কৃষকের ৩১ কোটি ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। জেলায় এবারের বন্যায় ২৬ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ২ হাজার ৭৯৬ হেক্টর জমির রোপা আমন, ৬১ হেক্টর জমির শাকসবজি এবং ৬৭ হেক্টর বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ রোপা আমনে ২৯ কোটি ১১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, শাকসবজিতে ১ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং বীজতলায় ৭০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
কুড়িগ্রাম খামারবাড়ির উপপরিচালক মঞ্জুরুল হক বলেন, নদনদীর পানি নেমে গেছে, অনেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। এর ফলে আমাদের কাছে রাখা ৬০০ হেক্টর বীজতলা এখন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাজে লাগছে। চর এলাকাগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা স্থানীয় জাতের ধান ছিটিয়ে নতুন করে বপন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এছাড়াও সরকারিভাবে যে বীজতলা করে দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকেও কৃষক বীজ নিয়ে কাজে লাগাচ্ছে। এতে বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জামালপুর জেলার নদী তীরবর্তী এলাকায় টানা প্রায় দুই সপ্তাহের স্থায়ী বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ঘরবাড়ি ও ফসলের। বন্যার পানিতে নষ্ট হয়েছে ঘরবাড়ি ও ভেসে গেছে রোপা আমনসহ বীজতলা ও সবজিখেত। কৃষি বিভাগের মতে, এবারের বন্যায় জেলার ১৯ হাজার ৫৫৩ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়। যার মধ্যে রোপা আমন ১৯ হাজার ২৮৩ হেক্টর, রোপা আমন বীজতলা ১২০ হেক্টর, আর ১৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা সবজিখেত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এবারের বন্যায় জেলার ছয় উপজেলার ১৬৯ গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যার পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে বাড়িঘরসহ প্রায় ১৮ কিলোমিটার কাঁচাপাকা সড়ক। এজন্য সরকারি সহায়তা চেয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। বন্যায় বাড়িঘর ও ফসলের ক্ষতির কথা স্বীকার করে জেলা প্রশাসন ও জেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
এবারের বন্যায় ফরিদপুরে ৯ উপজেলার পাঁচটিতে ২ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে পদ্মা, মধুমতী ও আড়িয়াল খাঁ অববাহিকার কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বর্ষা মৌসুমে চলমান বন্যায় আউশ ও রোপা আমন ১ হাজার ৭ হেক্টর, সবজি ৭৬ হেক্টর, মরিচ ৫০ হেক্টর, কলাবাগান ২৭ হেক্টরসহ ২ হাজার হেক্টরের অধিক জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. হযরত আলী বলেন, বন্যায় যেমন ফসলের ক্ষতি হয় তেমনি পানি নেমে গেলে ফসলের আবাদও ভালো হয়। এবারে ২৫ দিনের বন্যায় জেলার ২ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পরেই কৃষকদের মাষকলাই বীজ প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হবে।
চলতি বন্যায় পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল শস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর ও জেলা সদর, কাজীপুর, চৌহালী, বেলকুচি, কামারখন্দ উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। যমুনায় পানি কমছে, সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে এসব এলাকার কৃষি ও কৃষকের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।
সিরাজগঞ্জ জেলায় বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে নষ্ট হয়েছে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল। রোপা আমন, বোনা আমন, আমনের বীজতলা, আগাম শীতকালীন সবজি, কলা ও আখসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জেলার ৯টি উপজেলার ৭ হাজার ১৯২ হেক্টর জমির রোপা আমন, ১ হাজার ৩৫ হেক্টর জমির বোনা আমন, ১০১ হেক্টর জমির আমন বীজতলা, ৩৩০ হেক্টর জমির আগাম শীতকালীন সবজি, ২৮০ হেক্টর জমির আখ ও ১৮ হেক্টর জমির কলাসহ ৮ হাজার ৯৫৬ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ফলে আমন ধান ও শীতকালীন সবজিসহ কৃষি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জমি প্রস্তুত করা, বীজ লাগানো, সার ও কিটনাশক দেওয়া এবং শ্রমিক বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার পর ফসল তলিয়ে যাওয়ায় মূলধন সংকটে পড়েছেন কৃষকেরা।
টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত বন্যায় ৭৫০ হেক্টর জমির রোপা আমন ও ১০ হেক্টর জমির সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গাইবান্ধায় বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হয়েছে। ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে নদ-নদীর পানি। তবে রোপা আমনসহ প্রায় ১ হাজার ২৪৪ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। গাইবান্ধা জেলা কৃষি বিভাগ থেকে জানানো হয়, বন্যায় জেলায় ১ হাজার ২২০ হেক্টর জমির রোপা আমন ও ২৪ হেক্টর সবজিখেত নষ্ট হয়েছে।
রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই জেলায় ৩২৬ হেক্টর ফসলি জমির বিভিন্ন প্রকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুই দফা বন্যায় রংপুরের তিন উপজেলায় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তিস্তা নদীর পানি দফায় দফায় বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চলসহ নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের জমির রোপা আমন, আউশ ধান, রবিশস্য এবং শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত জেলায় ৭ হাজার ৯০০ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৬৭ হেক্টরের রোপা আমন, ৪ হেক্টরের বীজতলা ও ৫ হাজার ৪৬৯ হেক্টরের বোনা আমনসহ সর্বমোট ৭ হাজার ৯০০ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়। মাদারীপুর কৃষি বিভাগের সমীক্ষায় এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় কোটি টাকার ক্ষতিসাধন হয়েছে। বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচারক দুলাল হোসেন জানান, এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী না হলেও জেলার যমুনা তীরবর্তী অঞ্চলের উপজেলা, সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটের ৫ কোটি ৪৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকার ফসলহানি হয়েছে। এ তিন উপজেলায় ৫ হাজার ১০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনটি উপজেলায় ৪২১ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। আমনের ক্ষতি হয়েছে ৩০৫ হেক্টর জমির, আমন বীজতলা ২৩ হেক্টর, শাকসবজি ৩২ হেক্টর, মাসকলাই ২৩ হেক্টর এবং আখের ক্ষতি হয়েছে ৭ হেক্টর জমির। তিনটি উপজেলার মাসকলাইয়ের জন্য প্রণোদনা এসেছে।
