আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রাসেল এবং তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন রিমান্ডে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। রিমান্ডের প্রথম দিন গতকাল শনিবার সকাল থেকে তাদেরকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বিশেষ করে লাখ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে আত্মসাত্ করা শত শত কোটি টাকার সন্ধান জানার চেষ্টা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। রাসেল ও তার স্ত্রীকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার এসআই ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে ইভ্যালির এমডি রাসেল ও তার স্ত্রীর রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার পর আমরা দুটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। প্রথমত, যে মামলাটি হয়েছে, সেখানে ভুক্তভোগীর সঙ্গে কীভাবে প্রতারণা করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, লাখ লাখ গ্রাহকের যে বিশাল অঙ্কের টাকা আত্মসাতের কথা শোনা যাচ্ছে, সেই টাকা কোথায় আছে? প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের অংশ হিসেবে শুক্রবার রাতে রাসেলের কাছে কিছু প্রশ্ন জানতে চাওয়া হয়েছিল। তখন সে হঠাত্ করেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং বুকে ব্যথা অনুভব করছে বলে জানায়। তখন তাকে হাসপাতালে পাঠানোয় বেশ খানিকটা সময় অপচয় হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে রাসেল ও তার স্ত্রীকে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তারা দুজনই স্বাভাবিকভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। রিমান্ডে পাওয়া সব তথ্য আদালতের কাছে উপস্থাপন করা হবে বলে জানান এসআই ওয়াহিদুল।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল প্রকাশ্যে থাকলেও কোম্পানির প্রায় সব ধরনের কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ছিল তার স্ত্রী শামীমা নাসরিন এবং তার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের হাতে। কোম্পানির হেড অব এইচআর ছিলেন রাসেলের শ্যালিকা সাবরিনা নাসরিন। ডিরেক্টর (টেকনিক্যাল) শামীমার বোনের স্বামী মামুনুর রশীদ। ডিরেক্টর পারচেজ অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট শামীমার বন্ধু আতিকুর রহমান। আর তার দুই ভাগ্নে জাহেদ ও জুবায়ের দেখতেন মোটরসাইকেলের বিষয়গুলো। তবে কোম্পানিকে সঠিক পথে চালিয়ে নিতে জবাবদিহিতা ও সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগের অভাব ছিল বলে জানা গেছে।
এদিকে এমডি রাসেলের মুক্তির দাবিতে আবারও মানববন্ধন করেছেন ইভ্যালির গ্রাহক ও সেলাররা। গতকাল বিকালে ধানমন্ডিতে ইভ্যালি অফিসের সামনে ২ শতাধিক গ্রাহক ও সেলার এ মানববন্ধন করেন। এসময় তারা রাসেলের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। মানববন্ধনে আমজাদ হোসেন আকাশ নামে এক সেলার বলেন, রাসেলকে আটকে রাখলে কখনোই সমস্যার সমাধান হবে না। যেহেতু তার (রাসেল) পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে তার দেশ ত্যাগের সুযোগ নেই। সুতরাং তাকে মুক্তি দিয়ে নজরদারিতে রেখে পাওনাদারদের টাকা ফেরত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।
ইভ্যালির অফিস ও অর্ডার বন্ধ : রাসেল ও তার স্ত্রী গ্রেফতারের পর হাজার হাজার পাওনাদারের উত্কণ্ঠার মধ্যেই ইভ্যালির অফিস আবার বন্ধ হলো। প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এখন বাসায় থেকে অফিসের কাজ করবেন বলে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পাতায় ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে গ্রাহকদের আশ্বস্ত করতে ইভ্যালি বলেছে, হোম অফিসের মধ্যেও তাদের সব কার্যক্রম ‘স্বাভাবিক’ সময়ের মতো চলবে। এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাত ২টায় ‘টি-১০’ সংক্রান্ত এক ‘জরুরি নোটিসে’ ইভ্যালির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আমাদের প্রধান দুজন সিগনেটরি সম্মানিত সিইও এবং চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে, আমাদের সেলারদের রেগুলার বিল দিতে পারছি না। এজন্য আমাদের স্বাভাবিক ডেলিভারি কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে। তাই আপনাদের (ক্রেতা) করা শুক্রবারের টি-১০-এর সব অর্ডার আপাতত রিকোয়েস্ট হিসেবে জমা থাকবে।’
যশোরে ইভ্যালির বিরুদ্ধে আরেক মামলা: এদিকে রাসেল ও শামীমার নামে এবার যশোরে মামলা করেছেন এক গ্রাহক। গত শুক্রবার জাহাঙ্গীর আলম চঞ্চল নামে এক ব্যক্তি কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলাটি করেন। গতকাল সকালে কোতোয়ালি মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলায় জাহাঙ্গীর অভিযোগ করেন, গত ২৯ মে ১ লাখ ৩০ হাজার ১৪০ টাকায় ভারতীয় বাজাজ কোম্পানির একটি পালসার মোটরসাইকেলের অর্ডার করেন তিনি। এরপর কয়েকটি কিস্তিতে পুরো টাকা পরিশোধও করেন। টাকা পরিশোধের ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে পণ্যটি ডেলিভারি দেওয়ার কথা ছিল। সাড়ে তিন মাসেও মোটরসাইকেল পাননি তিনি।
কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি ডিবির: ইভ্যালির মতো গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করা অন্যান্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার। গতকাল দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবিপ্রধান বলেন, ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জসহ এমন আরো প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা প্রতারণা করেছে। বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে পণ্য বিক্রির অফার দিয়ে যারা গ্রাহকদের পণ্য দেয় না, তারা মূলত প্রতারণা করছে। এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে, তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতারকদের বেশি বেশি ধরা হলে ধীরে ধীরে প্রতারণা কমে আসবে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার দিবাগত রাতে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে মো. রাসেল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করেন আরিফ বাকের নামে ইভ্যালির একজন গ্রাহক। এর পরের দিন গত বৃহস্পতিবার বিকালে তাদের গ্রেফতার করে র্যাব। পরে গুলশান থানার ঐ মামলায় শুক্রবার তাদের তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে হাজার-কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
