গাজী মো. শফিকুল হক
‘কিকঅফের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মনে কিছুটা ভয় কাজ করছিল, নার্ভাস লাগছিল। পারব তো। কিন্তু কিকঅফের বাঁশি বাজাতেই ভয় কেটে যায়, সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়’—বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ক্লাব হাউজ গ্যালারিতে বসে প্রথম নারী রেফারি হিসেবে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ফুটবল লিগ পরিচালনার অভিজ্ঞতা শোনাচ্ছিলেন সালমা আক্তার মনি।
মেয়ে হিসেবে পুরুষ ফুটবলে রেফারিং বলে কথা! চাপ সামলে সালমা দায়িত্ব পালন করলেন সহকারী রেফারির। ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রথম নারী রেফারি হয়ে গড়লেন ইতিহাস। ১৬ আগস্ট, কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম ও আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ-উত্তর বারিধারা ক্লাবের ম্যাচটা বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের পাতায় সোনালি অক্ষরে লেখা হয়ে গেছে। তবে ২০১৫ সালে আউটার স্টেডিয়ামে ও লালবাগ মাঠে পাইওনিয়ার লিগে ৫-৬টি ম্যাচ চালিয়েছিলেন সালমা। কিন্তু সেটি ছিল অনূর্ধ্ব-১৫ লিগ বয়সভিত্তিক।
নেত্রকোনা থেকে উঠে আসা সালমা তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। স্নাতক করছেন ইডেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, অ্যাথলেট থেকে ধীরে ধীরে ফুটবলার হওয়া, নেত্রকোনার অজপাড়া গায়ের মেয়েটির ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন তিরোহিতের পর রেফারিং জগতে আবির্ভাব। এবং আট বছর না যেতেই যোগ্যতা দিয়ে রেফারিংয়ের সর্বোচ্চ খেতাব অর্জন। শোনালেন রোমাঞ্চকর দিনগুলোর কথা, জানালেন শুরু থেকেই চেয়েছেন ফুটবলের সঙ্গে থাকতে, ‘আসলে ফুটবল খেলার সুযোগ ওভাবে পাইনি। কিন্তু ফুটবলের সঙ্গে থাকতে চেয়েছি সব সময়। এ কারণেই রেফারিংয়ে আসা।
একটা সময় পারিপার্শ্বিক কারণে মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে রেফারিং জগত্ থেকে বিদায় নিতে চেয়েছিলেন সালমা, সাবেক ফিফা রেফারি মাহমুদ জামাল ফারুকী নাহিদের অনুপ্রেরণায় অবসাদ-যন্ত্রণা ভুলে টিকে থাকেন। এবং ২২ বছর বয়সে ফিফাব্যাজধারী রেফারি। শোনালেন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাও; ২০১২ সালে রেফারিং কোর্স করার পরের বছরই নারী ফুটবলে দায়িত্ব পালন শুরু করেন সালমা। ২০১৯ সালের ২১ ডিসেম্বর প্রথমবার পরীক্ষা দিয়ে জয়া চাকমার মতো তিনি পাশ করলেও বয়সের কারণে আন্তর্জাতিক ম্যাচ চালানোর স্বীকৃতি পাননি, সেটা পেয়েছেন চলতি বছরের জানুয়ারিতে।
বারিধারা-আরামবাগের ম্যাচ পরিচালনার ভিডিওটা বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফায় পাঠিয়ে দিয়েছে বাফুফে, সালমার পারফরম্যান্স মূল্যায়নের জন্য। কেননা দুই দিন পরই ফিফা রেফারিদের ২০২২ সালের জন্য পরীক্ষা হয়েছে, সেখানেও সফল হয়েছেন তিনি। বাফুফের রেফারিজ কমিটি সালমাকে এলিট প্যানেলের রেফারি করার জন্য ফিফার কাছে আবেদন জানিয়েছে। এএফসির এলিট কোর্সে প্রবেশ করতে পারলে এশিয়ার নারী ফুটবলের শীর্ষ স্তরের ম্যাচ পরিচালনা করতে পারবেন সালমা।
সাবেক ফিফা রেফারি ও বাংলাদেশের রেফারিং কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রায় চার দশকের বেশি জড়িত ইব্রাহীম নেসার; বাফুফের রেফারিজ কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান জানান, ‘ছেলেদের ম্যাচ পরিচালনার সামর্থ্য সালমার আছে। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের খেলায় নারীরা রেফারিং করছেন। এটা সামগ্রিকভাবে দেশের ফুটবলের জন্য ইতিবাচক।’
