‘এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে মন নাহি চায়’—এই জনপ্রিয় গানটি লিখিয়াছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার আর অসম্ভব দরদি কণ্ঠে গাহিয়াছিলেন শ্যামল মিত্র। এই গানের মধ্যে পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য আস্বাদন করিবার এক অপার ব্যাকুলতা ফুটিয়া উঠিয়াছে। একটু ভাবিয়া দেখিলে বুঝা যায়, পৃথিবীর সকল বিচক্ষণ মানুষের মধ্যেই এই আকুলতা রহিয়াছে। ঐ গানটির লেখক ও গায়ক—কেহই এই পৃথিবীতে আজ নাই। এখন আমরা যাহারা আছি, তাহারাও একদিন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করিব। কারণ, জন্মিলে মরিতেই হইবে। এই বিবেচনায় বিদ্বজ্জনেরা মনে করেন, যাহার আয়ু অধিক তিনিই তত অধিক এই পৃথিবীর রূপ-রস উপভোগ করিতে পারিবেন। অন্যদিকে যাহার যত আয়ু অধিক অবশিষ্ট রহিয়াছে তিনিই তত ধনী। এখন একজন অল্পবয়সি মানুষের আয়ু অধিক অবশিষ্ট রহিয়াছে, ইহা ভাবিবার কোনো কারণ নাই। যে কাহারো যে কোনো সময় পরকালের ডাক আসিতে পারে। তবে আমরা এইটুকু বলিতে পারি, তুলনামূলক স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন করিলে একজন মানুষ অনেক অধিক আয়ুষ্মান হইয়া থাকে। আর এই স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস। প্রকৃত অর্থে, খাবার হইল শরীরের জ্বালানি। সেই জ্বালানিতে যদি সমস্যা থাকে, তাহা হইলে মানুষের শরীর নামক ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিবেই। একটা সময় সকলের ধারণা ছিল, প্রবীণরাই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিতে থাকেন। তবে সেই ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখাইয়া এখন তরুণ, যুবক বা মধ্যবয়স্করা হার্ট অ্যাটাকের শিকার হইতেছেন।
এই ব্যাপারে আমরা বিগত কয়েক বত্সরের কিছু পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টিপাত করিতে পারি। বিশ্বব্যাপী প্রতি বত্সর প্রায় ২ কোটি মানুষ কার্ডিওভাসকুলার রোগে মারা যায়, যাহা বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ। আবার এই মৃত্যুহারের ৬০ শতাংশ হয় হার্ট অ্যাটাকের কারণে। দক্ষিণ এশিয়ার স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে করোনারি হূদেরাগের কারণে তিন-চতুর্থাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটিয়া থাকে। জানা গিয়াছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে হূদেরাগের কারণে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। সার্বিকভাবে গত ১০ বত্সরের বিশ্ব পরিসংখ্যান অধিক মাত্রায় দুশ্চিন্তার। সেই পরিসংখ্যানে বলা হইতেছে, তরুণ ও মধ্যবয়স্কদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হার প্রতি বত্সরে ২ শতাংশ করিয়া বৃদ্ধি পাইতেছে। চিকিত্সকদের মতে, অন্যান্য বেশ কিছু কারণসহ অস্বাস্থ্যকর খাবার, বিশেষ করিয়া ট্রান্সফ্যাট যুক্ত খাবার তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা দিনদিন বাড়াইয়া তুলিতেছে। খাবারের ট্রান্সফ্যাট হইল এককথায় ক্ষতিকর চর্বিজাতীয় খাবার। ইহা রক্তের ‘ভালো’ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাইয়া দেয় এবং ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াইয়া দেয়। মনে রাখিতে হইবে, রক্তে যেই সকল কোলেস্টেরল থাকে, সেইগুলির মধ্যে দুই ধরনের কোলেস্টেরল খুব গুরুত্বপূর্ণ। কম ঘনত্বের কোলেস্টেরল বা এলডিএল, যাহা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল হিসেবে গণ্য। এই ধরনের কোলেস্টেরল হূিপণ্ডের রক্তনালির দেওয়ালে চর্বি জমাট বাঁধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং রক্তনালিগুলি সরু হইয়া রক্ত চলাচলে বাধাগ্রস্ত করে। ইহাতে হূদেরাগের ঝুঁকি বাড়িয়া যায়। অন্যদিকে, উচ্চ ঘনত্বের কোলেস্টেরলের বা এইচডিএল, যাহা ‘ভালো’ কোলেস্টেরল হিসাবে বিবেচিত, ইহা রক্তের ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলকে রক্ত হইতে যকৃতে লইয়া যায় এবং রক্তনালির দেওয়ালে চর্বি জমিতে দেয় না। ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উত্স পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড ওয়েল (পিএইচও)। ডালডা বা বনস্পতি ঘি এবং তাহা দিয়া তৈরি বিভিন্ন খাবার, ফাস্টফুড ও বেকারি পণ্যে ট্রান্সফ্যাট থাকে। খাদ্যে উচ্চমাত্রার শিল্পোত্পাদিত ট্রান্সফ্যাটের কারণে প্রতি বত্সর পৃথিবীতে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ হূদেরাগে মৃত্যুবরণ করেন।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী ট্রান্সফ্যাটঘটিত হূদরোগে মৃত্যুর সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকিলেও ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণের খসড়া নীতিমালাটি এখনো চূড়ান্ত করিতে পারে নাই সরকার। আমরা আশা করিব, দ্রুত এই প্রবিধানমালা জারির ব্যবস্থা করা হইবে। একই সঙ্গে তরুণ জনগোষ্ঠীকেও সচেতন হইতে হইবে, তাহারা যেন হূদেরাগের ঝুঁকি এড়াইতে খাদ্যাভ্যাসে সঠিক পরিবর্তন আনিয়া ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার পরিহার করেন।
