মাটিদূষণ নিরসনে জৈব প্রযুক্তি

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:২৩

মাটি বা মৃত্তিকা হলো পৃথিবীর উপরিভাগের নরম আবরণ যা পরিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বর্তমানে এই মহামূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। মাটির উপরের স্তরের উত্কর্ষ মানের উপর মাটির উর্বরতা ও উত্পাদনশীলতা নির্ভর করে। কিন্তু মানুষ সৃষ্ট বিভিন্ন দূষণের ফলে মাটির উপরের স্তরের পুষ্টি পদার্থসমূহ অপসারিত হচ্ছে, মাটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন অণুজীবের দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপে ব্যাঘাত ঘটছে এবং মাটিতে বাইরের বিভিন্ন জৈব ও অজৈব উপাদানের সংযোজন ঘটছে। যার ফলে মাটির উর্বরতা ও উত্পাদনশীলতা নষ্ট হচ্ছে দিন দিন। মাটিদূষণ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে জৈবপ্রযুক্তি (বায়োটেকনোলজি) মাটির উর্বরতা এবং উত্পাদনশীলতা দুটোই বৃদ্ধি করে।

যে প্রযুক্তির সাহায্যে কোনো জীবকোষ, অণুজীব বা তার অংশবিশেষ ব্যবহার করে নতুন কোনো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবের উদ্ভাবন বা ঐ জীব থেকে প্রক্রিয়াজাত বা উপজাত দ্রব্য প্রস্তুত করা যায়, সে প্রযুক্তিকে জৈবপ্রযুক্তি বলে। অর্থাত্ জৈবপ্রযুক্তি হলো মানুষের পক্ষে কার্যকর উত্পাদনের জন্য সজীব জীবজগতের ব্যবহার। মাটিদূষণ নিরসনে বিভিন্ন জৈবিক প্রযুক্তি যেমন বায়োরিমেডিয়েশন, ফাইটোরিমেডিয়েশন ইত্যাদি প্রয়োগ করা যেতে পারে। এটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অত্যন্ত ফলপ্রসূ পদ্ধতি হতে পারে।

দূষিত মাটিকে জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ইন-সিটু প্রক্রিয়া অর্থাত্ যে স্থানের মাটি দূষিত হয় সে স্থানেই দূষণমুক্ত করা এবং অফসাইট প্রক্রিয়া বা মাটিকে স্থানান্তরিত করে তারপর দূষণমুক্ত করা। দূষিত মাটি জীবাণুমুক্ত করার জন্য সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো মাটি অপসারণ করা এবং ল্যান্ডফিলিং। যা কেবল দূষিত মাটিকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ করে, কিন্তু জীবাণুমুক্ত করার জন্য কিছুই করে না। কাজেই এ পদ্ধতিতে মাটিকে দূষণমুক্ত করাটা যথাযথ নয়। মাটির প্লাস্টিক দূষণ বর্তমানে একটি বড় সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানেও সিউডোমোনাস গ্রুপের কিছু ব্যাকটেরিয়া প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্যকে ধ্বংস করতে পারে। এ জাতীয় অনুজীবসমূহকে ব্যবহার করে মাটির প্লাস্টিকদূষণ রোধ করা যায়। অন্যথায় প্লাস্টিক হাজার বছর ধরে মাটির নিচে চাপা থাকবে। যার ফলে মাটির নিচে প্লাস্টিকের স্তর সৃষ্টি হবে; জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।  ফাইটোরিমেডিয়েশনের মাধ্যমে মাটির দূষিত পদার্থ দূর করা যায়। মাটির দূষিত পদার্থ দূরীকরণে উদ্ভিদ ব্যবহূত হলে তাকে ফাইটোরিমেডিয়েশন বলে। এ প্রক্রিয়ায় কিছু উদ্ভিদ মাটির দূষিত পদার্থসমূহকে আহরণ করে। বিভিন্ন দূষিত রাসায়নিক পদার্থ, ভারী ধাতু ইত্যাদিকে মাটি থেকে অপসারিত করায় মাটি হয়ে ওঠে দূষণমুক্ত ও উর্বর।

মাটিদূষণ রোধ করার জন্য একটি বায়োলজিক্যাল টুল হচ্ছে বায়োরিমেডিয়েশন। বায়োরিমেডিয়েশনকে বর্তমানে বায়োটেকনোলজির এক বিশেষ প্রয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় যা পরিবেশ সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর সমাধান। এই প্রযুক্তিতে প্রাকৃতিকভাবে বায়ু, পানি এবং মাটি দূষণকারী বস্তুকে অপসারণের জন্য অণুজীব ব্যবহার করা হয়। অর্থাত্ বায়োরিমেডিয়েশন হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং উদ্ভিদের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন দূষিত পদার্থ পরিবর্তন করে মাটি, পানি বা বায়ুকে দূষণমুক্ত করে। বায়োরিমেডিয়েশনের সময় অণুজীবসমূহ মাটির রাসায়নিক দূষককে শক্তির উত্স হিসেবে ব্যবহার করে এবং জারণ-বিজারণ বিক্রিয়ার মাধ্যমে মাটির দূষককে অণুজীবের ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে পরিণত করে। যার ফলে পরিবেশে ফিরে আসা বাই প্রোডাক্ট সাধারণত প্যারেন্ট দূষণকারীর চেয়ে কম বিষাক্ত আকারে থাকে। বায়োরিমেডিয়েশন বা ফাইটোরিমেডিয়েশন মাটির বিভিন্ন জৈবিক উপাদান এবং সবুজ উদ্ভিদ ব্যবহার করে দূষিত মাটির দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই প্রযুক্তি নির্দিষ্ট মাইক্রোফ্লায়া বা মাইক্রোবিয়াল কনসোর্টিয়াম বৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করে যা দূষিত মাটির কাঙ্ক্ষিত ক্রিয়াকলাপ সম্পাদনে সক্ষম। এটি মাটির তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে, কার্যকর টার্মিনাল ইলেকট্রন যোগ করে এবং পুষ্টি উপাদান যোগ করে। এভাবে বায়োরিমেডিয়েশনের মাধ্যমে ক্ষতিকারক জৈব দূষণকারীদের দ্রুত মাটিতে পরিবেশগতভাবে এবং অত্যন্ত নিরাপদ উপায়ে হ্রাস করার জন্য অণুজীবকে উদ্দীপিত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় জড়িত অণুজীবগুলি জৈব যৌগের বিপাকের মাধ্যমে শক্তি এবং কার্বন গ্রহণ করে। বায়োরিমেডিয়েশনের মাধ্যমে বিপজ্জনক দূষকগুলিকেও কম বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থে রূপান্তরিত করা যায়,  যেখানে বায়োডিগ্রেডেশন এবং বায়োট্রান্সফরমেশন জড়িত।

বিজ্ঞানের নানা অবদানের দরুন আমাদের দৈনন্দিন সব সমস্যার সমাধান নিমিষেই খুঁজে পাচ্ছি। মাটিদূষণ বর্তমানে উল্লেখযোগ্য একটি সমস্যা যার প্রতিকার এবং প্রতিরোধ অত্যন্ত জরুরি। জীববিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে নির্মিত প্রযুক্তিসমূহ ব্যবহার করে সহজেই মাটিদূষণ সমস্যার সমাধান করা যায়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মাটিদূষণ নিরসনে জৈবপ্রযুক্তির বিশদ ব্যবহার সবচেয়ে কার্যকর, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশবান্ধব হাতিয়ার।

n লেখক :শিক্ষার্থী,জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ