আনন্দ পট : লবণের রাজ্য সালার দে ইয়ুনি

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৯:৫৬

 

৪০ হাজার বছর আগের কথা। এলাকাটি ছিল মিঞ্চিন নামক এক সুবিশাল হ্রদের তলদেশে। নানাবিধ ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে একসময় হ্রদটির সমস্ত জল শুকিয়ে যায়। রেখে যায় পোপো আর উরু উরু নামের ছোট্ট দুটি হ্রদ। এবং সালার দে কোইপাসা ও সালার দে ইয়ুনি নামের দুটি লোনা জমি। এদের মধ্যে সালার দে ইয়ুনি আকারে বড় ও অধিক সমতল। যার কারণে বৃষ্টি হলেই জল দিগন্তজুড়ে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তৈরি করে পৃথিবীর সর্ববৃহত্ মোহনীয় সৌন্দর্যের লবণের আয়না। সালার দে ইয়ুনি দিনের চেয়ে পূর্ণিমা রাতে অধিক মনোমুগ্ধকর। দেখলে মনে হয় যেন পুরো আকাশ গলে পড়ছে পৃথিবীর বুকে!

স্থানটি সম্পর্কে একটি পৌরাণিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয় আয়মারা সম্প্রদায় বিশ্বাস করে, সুদূর অতীতে পার্শ্ববর্তী আগ্নেয়গিরি কুসকু, তুনুপা এবং কুসিনা নামে তিনজন দৈত্যাকার মানুষ ছিল। কুসকু বিয়ে করেছিল তুনুপাকে। বিয়ের কিছুদিন পরই কুসকু কুসিনাকে নিয়ে পালিয়ে যায়। এই খবর যখন তুনুপার কানে পৌঁছায়, তখন সে তার শিশুকে দুগ্ধ পান করাচ্ছিল। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে তুনুপার অজান্তেই চোখ বেয়ে জল গড়াতে লাগল। তার চোখের জল দুধের সঙ্গে মিশে সৃষ্টি হলো সালার। যার অর্থ লবণের সমতল। স্থানীয়দের কাছে তুনুপা একজন দেবী। তাই লোকমুখে সালার দে ইয়ুনি ‘সালার দে তুনুপা’ নামেও পরিচিত।

শুষ্ক মৌসুমে সালার দে ইয়ুনি ধবধবে সাদা লবণের চাদরে আবৃত থাকে। আর বর্ষাকালে পোপো হ্রদের পানি উপচে পড়ে প্লাবিত করে লবণের জমি দুটি। অবতারণা করে এক অনুপম সৌন্দর্যের। এর মধ্যেই আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে ছোট্ট ছোট্ট ‘লবণ দ্বীপ’। লবণের কারণে তেমন প্রাণের সপন্দন চোখে পড়ে না সেখানে। তবে মাঝেমধ্যে দেখা মেলে আন্দিজ শেয়াল আর বর্ষা মৌসুমে অসংখ্য ফ্লেমিঙ্গো। এখানকার লবণাক্ত তেতো পানিতে জন্মানো শেওলা আর ব্রাইন চিংড়ি এদের প্রিয় খাবার। প্রাণীগুলোর দেহের রং সাদা হলেও শেওলা ও চিংড়ির রঞ্জকের প্রভাবে পালকগুলো রক্তিমাভা ধারণ করেছে। এছাড়া বিরান ভূমিজুড়ে চোখে পড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্যাকটাস আর কষ্টসহিষ্ণু বন্য ঝোপঝাড়। ধারণা করা হয়, ১০ বিলিয়ন টনেরও বেশি লবণ মজুদ রয়েছে এখানে।

অঞ্চলটিতে লবণ ছাড়াও রয়েছে হরেক রকমের খনিজ সম্পদ। সোডিয়াম, পটাসিয়াম, লিথিয়াম আর ম্যাগনেসিয়াম। সেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী দেশীয় প্রযুক্তিতে বছরান্তে সামান্য কিছু খনিজ উত্তোলন করে বলিভিয়া সরকার। ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের কাছে খুবই পছন্দের একটি স্থান এটি। কাছেপিঠে বড় কোনো শহর নেই। কাজেই প্রয়োজনের তাগিদে এখানেই গড়ে উঠেছে বেশ কিছু হোটেল। এসব হোটেলের অধিকাংশই আবার বানানো হয়েছে লবণের আস্তরণে। সেগুলোর দেয়াল, ছাদ থেকে শুরু করে আসবাবপত্র পর্যন্ত কেবল লবণে ঢাকা!

লবণের রাজ্য সালার দে ইয়ুনির অবস্থান বলিভিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পোটোসের ড্যানিয়েল ক্যাম্পোস প্রদেশের আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশে। প্রায় সাড়ে দশ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার ওপরে অবস্থিত। চোখধাঁধানো লবণের হ্রদ, লবণের তৈরি হোটেল, ফুটন্ত কাদার পুল, বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী ইত্যাদির কারণে সালার দে ইয়ুনি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে প্রিয়। অপরূপ সৌন্দর্য আর মনোমুগ্ধকর রূপবৈচিত্র্যের কারণে প্রতি বছর পুরো পৃথিবী থেকে অসংখ্য পর্যটক আর ফটোগ্রাফারের দল ছুটে আসেন এখানে।

মো. মিজানুর রহমান