এডিপি বাস্তবায়নের ধীর গতি উন্নয়নের অন্তরায়

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:০৬

বর্তমান অর্থবছরের (২০২১-২২) জন্য ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি ৯ লাখ টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫১৫টি প্রকল্পের বিপরীতে, যা বিগত অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। এছাড়া সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১০ প্রকল্পে ৫৪ হাজার ৪৫১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মূল এডিপির পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা প্রায় ১১ হাজার ৪৬৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকার এডিপি অনুমোদন করা হয়েছে ৮৯টি প্রকল্পের বিপরীতে এখানে উল্লেখ্য যে অন্যান্য বছরের মতো এবারও দেশজ সম্পদ, বৈদেশিক অর্থায়ন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস তথা জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা কৌশল এবং লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনের জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরের এডিপি প্রণয়ন করা হয়েছে। যেখানে দারিদ্র্য বিমোচন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, কর্মসংস্থান সৃজন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত প্রবৃদ্ধি, বিদ্যুত্ উত্পাদন, আইসিটি শিক্ষার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্ষয়ক্ষতি পুনর্বাসন-সংক্রান্ত প্রকল্প, সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে এলাকাভিত্তিক প্রকল্প ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে (পিপিপি) বাস্তবায়িত নতুন প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে

অনুমোদিত এডিপির ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকার মধ্যে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে অর্থায়ন ১ লাখ ৩৭ হাজার ২৯৯ কোটি ৯১ লাখ ও বৈদেশিক উত্স থেকে অর্থায়ন ৮৮ হাজার ২৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ১১ হাজার ৪৬৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকার মধ্যে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে অর্থায়ন ৬ হাজার ৭১৭ কোটি ৪৮ লাখ এবং বৈদেশিক উত্স থেকে অর্থায়ন ৪ হাজার ৭৫১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ১ হাজার ৪২৬টি প্রকল্পের মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ১ হাজার ৩০৮টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১১৮টি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে ৮৯টি প্রকল্পসহ মোট প্রকল্প ১ হাজার ৫১৫টি।

খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ বরাদ্দ :১০টি খাতে ২ লাখ ১০ হাজার ৪২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট এডিপির প্রায় ৯৩.৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে প্রায় ৬১ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা বা বরাদ্দের প্রায় ২৭.৩৫ শতাংশ। বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ৪৫ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা (২০.৩৬%), গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাবলি খাতে প্রায় ২৩ হাজার ৭৪৭ কোটি (১০.৫৪%), শিক্ষা খাতে প্রায় ২৩ হাজার ১৭৮ কোটি (১০.২৯%), স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ১৭ হাজার ৩০৭ কোটি (৭.৬৮%), স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে প্রায় ১৪ হাজার ২৭৪ কোটি (৬.৩৪%), পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি খাতে প্রায় ৮ হাজার ৫২৬ কোটি (৩.৭৮%), কৃষি খাতে প্রায় ৭ হাজার ৬৬৫ কোটি (৩.৪০%), শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবা খাতে প্রায় ৪ হাজার ৬৩৮ কোটি (২.০৬%) এবং বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা (১.৫৯%)।

সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১০ প্রকল্প : সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১০ প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ৫৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া প্রকল্পের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প। প্রকল্পটিতে প্রায় ১৮ হাজার ৪২৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া মাতারবাড়ী আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল পাওয়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্টে প্রায় ৬ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) প্রকল্পে প্রায় ৫ হাজার ৫৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৬) প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ (১ম সংশোধিত) প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার ৮২৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ (২য় সংশোধিত) প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার ২২৭ কোটি ২০ লাখ, এক্সপানশন অ্যান্ড স্ট্রেংদেনিং অব পাওয়ার সিস্টেম নেটওয়ার্ক আন্ডার ডিপিডিসি এরিয়া প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার ৫১ কোটি ১১ লাখ ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ (১ম পর্যায়) (১ম সংশোধিত) প্রায় ২ হাজার ৮২৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। নতুন প্রকল্পে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রা ২ হাজার ৮৯৩ কোটি ও প্রকল্প ঋণ ১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে বরাদ্দবিহীনভাবে অননুমোদিত নতুন ৫৯৬টি প্রকল্প ও বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত নতুন ১৪১টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া পিপিপি প্রকল্প ৮৮টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ৩০ জুন ২০২২-এর মধ্যে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত প্রকল্প ৩৫৬টি। ২০২০-২১ অর্থবছরের আরএডিপিতে জুন ২০২১-এ সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত আরো ৭৩টি প্রকল্প ২০২১-২২ অর্থবছরে এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পরিস্থিতি পর্যলোচনায় দেখা যায় যে চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়িত হয়েছে ৩.৫২ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৮ হাজার ৩৩৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।  গত অর্থবছরে এ হার ছিল ৩.৮৯ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে ৮ হাজার ৩৫১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়ন করছে সরকার।

 আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, চলতি অর্থবছরের শুধু আগস্টে এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে ২.৩৮ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে ৫ হাজার ৬৪৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে গত অর্থবছরের আগস্টে এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছিল ২.৩৮ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে ৫ হাজার ৯৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা অর্থাত্ গত অর্থবছরের আগস্টের তুলনায় চলতি অর্থবছর টাকার অঙ্কে এডিপি বাস্তবায়ন বেড়েছে। পর্যালোচনায় আরো জানা যায় যে বছরের শুরুতে উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের টেন্ডার দেওয়া হয়। এই টেন্ডার প্রক্রিয়া হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ পেতে কিছু দিন সময় লাগে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়ে বিল ওঠানো শুরু করলেই এডিপি বাস্তবায়ন বাড়তে থাকে। এজন্য বছরের শুরুতে বাস্তবায়ন হার কম থাকলেও মাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এডিপি বাস্তবায়ন বাড়ে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপির) প্রায় ৮৫ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। মোট ১১ লাখ ৯৮ হাজার ১৮১ কোটি টাকার এডিপির বিপরীতে খরচ হয়েছে ১০ লাখ ১৪ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা, যা শতাংশ হিসেবে বাস্তায়নের হার ৮৪.৭১ ভাগ। ১০ বছরে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবছর হিসাবে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে এডিপি বাস্তায়ন সবচেয়ে কম ছিল অর্থাত্ এডিপি ৮০.৩৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছিল। আর ২০২০-২১ অর্থবছরের ১১ মাসে এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে ৫৮.৩৬ শতাংশ। সরকারের পক্ষ থেকে আগেই বলা হয়েছে, কোভিড-১৯-এর কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কারণে চলতি ও বিগত অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হার কম। তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। ঐ অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ৯৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অন্য অর্থবছরগুলোর বাস্তবায়ন হার ছিল ৯০ শতাংশের বেশি। কিন্তু গত অর্থবছরে সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত হয়েছে ৭৪ শতাংশের মতো। অর্থ মন্ত্রণালয় প্রদত্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে কয়েক বছর ধরে বাজেট বাস্তবায়ন ৮০-৮৫ শতাংশের ওপরে যায় না, যদিও করোনার অতিমারিকে আর কারণ হিসাবে দেখানোর অবকাশ নেই। এটা দিবালেকের মতো সত্য যে সক্ষমতা ও একাগ্রতার স্বল্পতা, প্রকল্প পরিচালকদের প্রকল্প এলাকায় অনুপস্থিতি, নজরদারির স্বল্পতা, অর্থ ছাড়ের দীর্ঘসূত্রিতা ও পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প অনুমোদনের বিলম্ব ইত্যাদিই অর্থব্যয় না হওয়ার কারণ। বাজেট প্রণয়ন করতে হবে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতার নিরিখে, যা বাস্তবে হয়ে ওঠে না একদিকে রাজনীতি অন্যদিকে আমলাতন্ত্রের কারণে। এখন সরকারের উচিত, দক্ষতার ঘাটতি পূরণ এবং যারা বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করন। তাহলেই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হবে।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা