খাদ্য, জ্বালানি ও মূল্যবান সম্পদের এক বিশাল ভান্ডার সমুদ্র। বাংলাদেশজুড়ে বিস্তীর্ণ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে। ইতিমধ্যে ব্লু ইকোনমিতে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৯৬০ কোটি ডলারের সম্পদ আহরণ করছে। যদিও এই সম্ভাবনা আকাশচুম্বী! কোনো কোনো পরিসংখ্যান বলছে, সমুদ্র থেকে বছরে আড়াই লাখ কোটি ডলারের সম্পদ আহরণ সম্ভব। এই সম্ভাবনা সার্থক করতে ব্লু বায়োটেকনোলজিও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেজ্ঞরা বলছেন, ব্লু বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে উচ্চ পুষ্টিমানসমৃদ্ধ খাদ্য, বিরূপ আবহাওয়া সহিষ্ণু উদ্ভিদ জাত, ওষুধ, কসমেটিকস উত্পন্ন করা সম্ভব, যা মানবকল্যাণেও ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশে দিনদিন কমে যাচ্ছে আবাদি জমির পরিমাণ, বাড়ছে খাদ্যের চাহিদা। অথচ সামুদ্রিক মাছ থেকে উচ্চ প্রোটিন ও ওমেগা অ্যাসিড সংগ্রহ করে জনজীবনে পুষ্টি ও ফ্যাটের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। সামুদ্রিক প্রাণী যে কেবল মানুষেরই খাবারের চাহিদা মেটায় তা নয়। বায়োটেকনোলজির ব্যবহার গবাদি পশুর খাদ্যের জোগানে এবং মাছের পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি, খাদ্যের মান সমৃদ্ধকরণ ও ফলনেও অনবদ্য ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী গ্রিন হাউজের প্রভাবে বাংলাদেশেও জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। এতে করে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় জমিতে বাড়ছে লবণাক্ততার মাত্রা। কৃষি সার্ভিসের তথ্যমতে, গত ৪০ বছরে দক্ষিণাঞ্চলে ২৭ শতাংশ জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কমে গেছে উত্পাদনের পরিমাণ। দেশে প্রচলিত সব লবণাক্ততা সহনশীল জাতের পাশাপাশি যদি সামুদ্রিক জীব থেকে বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে জিন স্থানান্তর করা যায়, তবে এই উত্পাদন অধিক হারে বেড়ে যাবে।
এছাড়া বাংলাদেশে প্রতি বছর বন্যায় বিপুল পরিমাণ ফসল বিনষ্ট হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৮ হেক্টর জমি বন্যাকবলিত হওয়ায় ফসলে ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতির হাত থেকেও সমুদ্র আমাদের রক্ষা করতে পারে। কেননা, সমুদ্রের অভ্যন্তরে সূর্যের আলোর গভীরতা পৌঁছায় না এবং সেখানে অক্সিজেনেরও স্বল্পতা থাকে। এমন বিরূপ পরিবেশে যেসব উচ্চ সহ্যক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রো অর্গানিজম জন্মায়, তাদের জিন স্থলের উদ্ভিদে স্থানান্তর করে দেশের কৃষি খাতে বন্যার ক্ষতি মোকাবিলায় বিপ্লব আনা সম্ভব। বায়োটেকনোলজির কল্যাণে সমুদ্রের সম্পদ থেকে উন্নতমানের কসমেটিকস, পেইন কিলার, এন্টিবায়োটিকস ও এন্টিক্যানসার ড্রাগসসহ বিভিন্ন ওষুধ তৈরি করা সম্ভব, যা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম করা যাবে। তাই সম্ভাবনাময় এই খাতে উদ্ভাবনে, ব্যবহারে ও বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাস্তব জ্ঞানের অভাবে অনেকে বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। এমন পরিস্থিতি থেকে অতিসত্বর বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের আগ্রহী করতে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সরকারের যৌথ প্রচেষ্টা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ব্লু বায়োটেকনোলজির সঠিক বিকাশে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে ব্লু ইকোনমিক। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্যোগ, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব কাটিয়ে বাংলাদেশও উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
