দেশ সেরা ফুটবলার, যাদের পায়ের যাদুতে লাখ লাখ ফুটবলপ্রেমী হেসেছেন আনন্দে দিশে হারা হয়েছেন, সেই জনপ্রিয় খেলোয়াড় কাজী সালাহউদ্দিন, আশরাফ উদ্দীন চুন্নু, গোলাম রব্বানী হেলাল, কাজী আনোয়ার হোসেন, মনি, আশিষসহ দেশি খেলোয়াড় ছাড়াও শ্রীলঙ্কার পাকির আলী ও প্রমলালকে গ্রেফতার করে রমনা থানার হাজতে আনল। বাংলাদেশের ফুটবলারদের জন্য এটা ছিল এক আশ্চর্যজনক ঘটনা। যা তারা কখনো কল্পনাও করেননি।
স্পোর্টস রিপোর্টার
আজ ক্রীড়াঙ্গনের কলঙ্কিত দিন। ঢাকার ফুটবলের এক কলঙ্কময় দিন। ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার। মর্যাদার লড়াইয়ে মুখোমুখি জনপ্রিয় মোহামেডান-আবাহনী। লীগের শেষ ম্যাচটির অপেক্ষায় লাখো ফুটবলপ্রেমী। দিনটির কথা মনে হলেই আঁতকে উঠেন সেই দিন মাঠে থাকা সহকারী রেফারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপপরিচালক শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক আব্দুর রশিদ। ৩৯ বছর আগের ঘটনা। জীবনের ৭০ বছর পেরিয়ে আজও সেই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন আব্দুর রশিদ। মাঠের একজন নিবেদিত প্রাণ ফুটবল রেফারি আব্দুর রশিদ। গ্যালারি ভরা দর্শক আর দর্শক। স্টেডিয়ামের আশপাশের ভবনগুলোর ছাদে দর্শকের ভিড়। ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর, ঢাকা স্টেডিয়াম। লীগের শেষ ম্যাচ মোহামেডান-আবাহনীর মর্যাদার লড়াই। কারণ এক ম্যাচ বাকি থাকতেই মোহামেডানের শিরোপা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। মোহামেডানকে হারালে রানার্সআপ হবে আবাহনী। গ্যালারীতে তিলধারণের ঠাই নেই। দ্বিতীয়ার্ধের ২৬ মিনিটে মোহামেডানের রাইট আউট ব্রেক ফেল খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত কোহিনূরের গোলে এগিয়ে গেলে ১-০ তে এগিয়ে যায়। আকাশি-হলুদ গ্যালারিতে নিস্তব্ধতা না কাটতেই যেন গর্জে উঠল দর্শকরা গোল- গোল ধ্বনিতে, আবাহনীর রাইট আউট আনোয়ারের জোরাল শট মোহামেডানের গোলরক্ষক মোহসীন ফিরিয়ে দেয়। এ সময় আবাহনীর খেলোয়াড়েরা দাবি করে গোল হয়েছে। সেই ম্যাচের রেফারি মুনির হোসেন লাইন্সম্যানের দায়িত্বে থাকা সহকারী রেফারি মহিউদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করে আবাহনীর গোলের দাবি নাকচ করে দেন। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুব্ধ হয়ে আবাহনীর আনোয়ার, সালাউদ্দিন, চুন্নু, হেলালসহ খেলোয়াড়েরা চড়াও হয় রেফারি ও সহকারীদের উপর। মাঠের দর্শকও গ্যালারিতে ইটপাটকেল যুদ্ধে মেতে উঠে। পুলিশ মারমুখি হয়ে গ্যালারিতে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়েন। গোটা স্টেডিয়াম এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। স্টেডিয়ামের বাইরে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরসহ দুই দলের সমর্থকদের তাণ্ডব। পুলিশের কঠোর পাহারায় দুদলের খেলোয়াড়রা মাঠ ছাড়ে। সেই রাতেই পুলিশ কাজী সালাহউদ্দিন, আশরাফ উদ্দীন চুন্নু, গোলাম রব্বানী হেলাল, কাজী আনোয়ার হোসেন, মনি, আশিষসহ দেশি খেলোয়াড় ছাড়াও শ্রীলঙ্কার পাকির আলী ও প্রমলালকে গ্রেফতার করে রমনা থানার হাজতে আনল। শ্রীলঙ্কা দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের খেলোয়াড়দের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। বন্দি হন দেশ সেরা আবাহনীর তারকা ফুটবলাররা। সকালেই তাদের হাজির করা হলো শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে স্থাপিত ‘ক’ আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসকের আদালতে।
সেই দিনে মাঠে ছিলেন আব্দুর রশিদ, জানাচ্ছিলেন তার দুঃসহ স্মৃতির পেছনের কথা। আটকের দুঃসহ স্মৃতির বর্ণনা করতে গিয়ে আব্দুর রশিদ জানালেন, ভোররাতে পুরান ঢাকার বাংলাবাজারের ফরাশগঞ্জের বাড়িটি ঘিরে ফেলে আমাকে ধরে আনা হলো মতিঝিল থানায়। আমাকে বলা হলো, আমরা যে ভাবে বলবো ঠিক সে ভাবেই সাক্ষী দিতে হবে। একে একে রেফারি মুনির হোসেন, সহকারী মহিউদ্দিন চৌধুরী ও চতুর্থ রেফারি আব্দুল আজিজকেও ধরে এনে হাজির করা হলো। সামরিক আদালতে আমাদের সাক্ষী দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে জানতে পারি ফুটবলার কাজী আনোয়ারকে এক বছর, হেলালকে ছয় মাস, কাজী সালাহউদ্দিন ও আশরাফ উদ্দিন চুন্নুকে ১ মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর তাদের সাধারণ অপরাধীদের মতো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। খেলার মাঠের এই ঘটনা নিয়ে সারা দেশের আবাহনী-মোহামেডানসহ সর্বস্তরের ফুটবলপ্রেমীরা রাজপথে প্রতিবাদে নেমে আসলে সালাহউদ্দিন ও চুন্নুকে যশোর এবং আনোয়ার আর হেলালকে রাজশাহী কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সারাদেশে ফুটবল দর্শকদের আন্দোলনের মুখে ১৭ দিনের মাথায় ৮ অক্টোবর তাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে ফুটবলার সালাহউদ্দিন অবসর নিলে প্রেসিডেন্ট এরশাদ সালাহউদ্দিনকে বঙ্গভবনে রাজকীয় মর্যাদায় লালগালিচা সংবর্ধনা দেন।
