স্থগিত ১৬০ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ও ৯টি পৌরসভার ভোটগ্রহণ গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনেও সহিংসতা, প্রভাব বিস্তার, এজেন্ট বের করে দেওয়া, ব্যালট পেপারে জোর করে সিল মারা, ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
কক্সবাজারের মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় নির্বাচনি সহিংসতায় দুই জন নিহত হয়েছেন। ৩০-৩৫ জন আহত হয়েছেন। খুলনায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সাতক্ষীরায় প্রার্থীর বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর হয়েছে। চট্টগ্রামে দুই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। অনেক জায়গায় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অমান্য করতে দেখা গেছে স্থানীয় প্রশাসনকে। ভোটে সহিংসতার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, স্থানীয় সরকারের তৃণমূলের নির্বাচনে সংঘর্ষ ও সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা খুবই দুঃখজনক। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য কমিশন থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। কেউ দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল সোয়া ১০টার দিকে মহেশখালীর কুতুবজুম ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়ায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ কামাল ও বিদ্রোহী প্রার্থী মোশাররফ হোসেন খোকনের সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলিতে আবুল কালাম (৩২) নিহত হন। অন্যদিকে দুপুর সাড়ে ১২টায় ব্যালেট পেপার ছিনতাই রোধ করতে গেলে কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ ইউনিয়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হালিম (৩৫) নিহত হয়েছেন। সহিংসতার কারণে মহেশখালীর কুতুবজুমের দুটি, কুতবদিয়ার বড়ঘোপের দুটি ও টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের দুটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল।
জেলা ও উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ছুরিকাঘাত ও গোলাগুলির ঘটনায় কুতুবজুম ইউনিয়নের ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দুই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়ে পড়ে। এ সময় কুতুবজুমের পশ্চিমপাড়া গ্রামের ছোট মিয়ার ছেলে আবুল কালাম নিহত হন। আহত হন চার জন।
নৌকা প্রতীকের চেয়াম্যান প্রার্থী শেখ কামাল বলেন, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোশাররফ হোসেন খোকনের সমর্থকেরা কুতুবজুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জামিয়ুস সুন্নাহ দারুল উলুম মাদ্রাসা কেন্দ্র দখল নিতে গোলাগুলি ও ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর করা অভিযোগ অস্বীকার করে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোশাররফ হোসেন খোকন বলেন, প্রায়ই বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তার এজেন্টদের বের করে দেয় নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সন্ত্রাসী বাহিনী। কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পিলটকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে আবদুল হালিম নিহত হন। পিলটকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কুতুবদিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। তাদের মধ্যে আহত ১৮ জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
নিহত আবদুল হালিম বড়ঘোপ ইউনিয়নের গোলদারপাড়া এলাকার মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কিছু লোক ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। এটি রোধ করতে জটলার ভেতরে ঢুকে যান হালিম। ছিনতাই ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্য গুলি চালালে আবদুল হালিম আহত হন। তাকে উদ্ধার করে কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন কুতুবদিয়া থানার ওসি ওমর হায়দার বলন, নিহতের লাশ কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে। তিনি নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সমর্থক ছিলেন। টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনছিপ্রাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও লম্বাবিল এমদাদিয়া মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় নির্বাচন কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে উত্তেজিত জনতা। এ সময় সড়ক অবরোধ ও গাড়ি ভাঙচুরেরও ঘটনা ঘটে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে স্থানীয়রা।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, সন্দ্বীপ উপজেলার সন্দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চলাকালে রহমতপুর ইউনিয়নে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিয়নে ইউপি সদস্য প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যেও ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
সূত্রগুলো জানায়, সকালে রহমতপুর ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী ফরিদুর রহমান কিশোর এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মশিউর রহমান বেলালের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে সারিকাইত ইউনিয়নে দুই ইউপি সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে এবং গাছুয়া ইউনিয়নের ১ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদপ্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়।
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, মোরেলগঞ্জের বনগ্রাম, চিতলমারী উপজেলার পাটরপাড়া, কলাতলাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে ধাওয়া ও পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দুপুর সোয়া ১২টায় বনগ্রাম ইউনিয়নের বাধাল এলাকায় নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া ও পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এদিকে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে বাগেরহাটে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন কচুয়া উপজেলার ধোপাখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুদ রানা লালন, ফকিরহাট উপজেলার শুভদিয়া ইউপির স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আবদুল আউয়াল ও বাহিরদীয়া ইউপির স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসমাইল সিদ্দিকী খোকন।
খুলনা অফিস জানায়, আওয়ামী লীগের প্রার্থী গাজী জাকির হোসেনের সমর্থক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আনছার আলীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ককটেল বিস্ফোরণে পাঁচ জন আহত হয়েছে। আহতরা হলেন—মো. ইমরান শেখ (২৫), আহাদ শেখ (২৬), কামাল মল্লিক (৩৫), সাগর শেখ (২২) ও ওলি আলমগীর মোল্লা (৩০)। আহতদের খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
অপরদিকে দুপুর ৩টার দিকে কয়রা সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এস এম বাহারুল ইসলামের সমর্থকরা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রবিউল ইসলাম রবিনকে মারধর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।
কলারোয়া (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, সাতক্ষীরার কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া ইউপি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শহিদুল ইসলামের বাড়িতে প্রতিপক্ষরা হামলা চালান। ভোটে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। উপজেলার ১২টি ইউপির মধ্যে ১০টি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে কেড়াগাছি ইউপির একটি ভোটকেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছে।
