যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে করা আইএনএফ চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর রুশ রাজনীতিকরা এর সমালোচনা করেছেন। ন্যাটো অবশ্য এর জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো উদ্বেগের দৃষ্টিতে দেখছে পুরো বিষয়টিকে।
যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা চুক্তির প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা ছয় মাসের জন্য স্থগিত রাখবে। ১৯৮৭ সালে দুই পরাশক্তির মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিটি বিশ্ব শান্তি রক্ষার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়ে এসেছে। এই চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া ৫শ’ থেকে সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার পরমাণু অস্ত্র ভূমিতে মোতায়েন বা পরীক্ষা চালানো থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছে। উভয় দেশই অনেকবার একে অন্যের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে স্পষ্টত জানিয়ে দিয়েছে নিজের অবস্থান। রাশিয়া বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে যাচ্ছে, এক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানে মস্কোর উদ্যোগের কোনো মূল্যই ওয়াশিংটন দেয়নি।
রুশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান কনস্তানতিন কোসাচেভ বলেন, ‘পুরো বিশ্বকে আমি অভিনন্দন জানাই। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ধ্বংস করার আরও একটি পদক্ষেপ আজ নিয়েছে।’ রুশ সিনেটর ইগোর মরোজোভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে তার ফলে পুরো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি হুমকি তৈরি হলো। তবে সবচেয়ে বেশি হুমকিতে পড়বে রাশিয়া। কারণ চুক্তি থেকে বেরোনোর পর ইউরোপে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যা করতে যাচ্ছে তার সুবিধা পাবে রাশিয়াও। কারণ এরপর ইউরোপ ও চীনকে কভার করে এরকম মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করতে মস্কোর সামনে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকল না।
মার্কিন কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে আসছিলেন যে, চীন এশিয়ায় ক্রমাগত সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছে। দেশটি যে পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে সেটি আইএনএফের পাল্লা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন করতে পারছিল না। রাশিয়ার জন্য সমস্যা হচ্ছিল না, কারণ চুক্তি নির্ধারিত পাল্লার মধ্যে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র কোন পথে যাবে তা নিশ্চিত নয়। তবে বিষয়টি ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ন্যাটোর মহাসচিব জেনস স্টোলটেনবার্গ শুক্রবার বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে অভিযোগ করে বলেন, রাশিয়া কয়েক বছর ধরেই চুক্তি লঙ্ঘন করে দূরপাল্লার অস্ত্র তৈরির পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সব ন্যাটো রাষ্ট্র মার্কিন সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে, পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হতে ছয় মাস সময় লাগবে। তিনি বলেন, রাশিয়া যে ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে তা ইউরোপের বেশিরভাগ স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম। এ কারণে ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্ররা আতঙ্কিত। তারা চায় না ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনায় ব্যর্থতার জন্য ১৯৮৩ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটুক। তখন পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়নের এসএস-২০ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনকে কেন্দ্র করে সংকট নিরসনে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় ন্যাটোর মিত্ররা মার্কিন ক্রুজ এবং পাশিং ২ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপের বুকে বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
ট্রাম্প শুক্রবার ওই ঘোষণা দেওয়ার আগে ইইউ পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ফেদেরিকো মোগেরিনি চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার জন্য উভয় দেশের প্রতি আহ্বান জানান। রুমানিয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমাদের এ মহাদেশ অন্য সুপারপাওয়ার দেশগুলোর ক্ষমতা প্রদর্শনের যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠুক সেটা আমরা চাই না’। ১৯৮৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ চুক্তিতে সই করেন। গর্বাচেভ ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, ‘এটি ভালো মানুষের কাজ হচ্ছে না।’ লন্ডন ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা চ্যাটাম হাউসের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসিয়া লুইস বলছেন, আইএনএফ চুক্তির কার্যকারিতা কেবল রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই দুই দেশের মধ্যে বিবাদের ফলে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা ঘটে গেলে পুরো বিশ্বের ওপর তার প্রতিক্রিয়া হবে। তিনি বলেন, ‘অনেক দেশই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগ দিয়ে পরমাণু, রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলো ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন হলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি এসব আন্তর্জাতিক চুক্তির ঘোরতর বিরোধী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইন শাসন সমুন্নত রাখার দায়িত্ব সবার।’ ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের পরমাণু অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইএনএফ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। তবে স্বাধীন রুশ সামরিক বিশ্লেষক পাভেল ফেলজেনহাওয়ার মনে করেন, এ নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলেও রাশিয়া তড়িঘড়ি কিছু করবে না।
