সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, চীনকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে আমরা ভাগ্যবান। অনেকে মনে করছেন, মন্ত্রী মহোদয় কি একটু বাড়িয়েই বলেছেন? যারা এমনটি বলছেন, তাদের কথা হলো, চীন আমাদের স্বীকৃতি দিতে বঙ্গবন্ধু হত্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল ভুট্টোর অনুরোধে। চীনের বিরোধিতার কারণেই আমরা বহুদিন জাতিসংঘের সদস্য হতে পারিনি, আর চীন নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য পদ পাওয়ার পর প্রথম ভেটোটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ রোধ করতে চীন ভারত সীমান্তে কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন করেছিল, কিন্তু ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কারণে চীন এ নিয়ে এগোতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু হত্যায় চীনেরও একটা ভূমিকা ছিল বলে অনেকে মনে করেন, কেননা চীন তখন চীনপন্থি আব্দুল হক, তোহা, সিরাজ শিকদারসহ কট্টর বঙ্গবন্ধুবিরোধীদের আর্থিক সাহায্য এবং অস্ত্র প্রদান করত। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান চীন গেলে সে দেশের কর্তৃপক্ষ জিয়াকে বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য মোবারকবাদ জানিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার দুই দিনের মাথায়ই চীন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, এগুলো অতীতের কথা। কিন্তু অতীত খুব বেশি তিক্ত হলে তা কিন্তু ভোলা যায় না। জাপানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আজ বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ বটে। কিন্তু জাপানের মানুষ আজও তাদের দেশে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের জন্য ক্ষমা করতে পারছে না।
আমরা তো সকলের সঙ্গেই বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু প্রতিবন্ধকতাগুলোই সমস্যা। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা রোহিঙ্গাদের নিয়ে। এ কথা বলা মোটেও অতিরঞ্জিত হবে না যে, চীন চাইলে ২০১৭ সালেই রোহিঙ্গা সমস্যা নিরাপত্তা পরিষদেই সমাধান করে দিতে পারত। সে বছর যখন রোহিঙ্গা বিষয় নিরাপত্তা পরিষদে উঠেছিল তখন চীন ও রাশিয়া রোহিঙ্গা বিষয়ে মিয়ানমারবিরোধী প্রস্তাবে ভেটো না দিলে নিরাপত্তা পরিষদ প্রয়োজনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা নিলে রোহিঙ্গা সমস্যার তখনই সমাধান হতো, কেননা নিরাপত্তা পরিষদ হচ্ছে একমাত্র সংস্থা, যার রয়েছে পুলিশি এবং প্রয়োগ ক্ষমতা, যে ক্ষমতা জাতিসংঘের অন্য কোনো অঙ্গের নেই। ২০১৭ সালে আলোচনার পরও নিরাপত্তা পরিষদে আরো একাধিক বার রোহিঙ্গা বিষয় উত্থাপিত হয়েছে। কিন্তু চীন ও রাশিয়া প্রতিবারই বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব নিয়ে মিয়ানমারের পক্ষে ভেটো দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। চীনের সঙ্গে অবশ্য রাশিয়াও ছিল, কিন্তু চীন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে রাশিয়াও তাই করত এমনটা ভাবাই যুক্তিসংগত। নিরাপত্তা পরিষদ ছাড়াও জাতিসংঘের অন্যান্য জায়গায় যখনই রোহিঙ্গা প্রশ্নে আলাপ হয়েছে, একটি ছাড়া, তার সব কটিতেই চীন মিয়ানমারের পক্ষে, অর্থাত্ বাংলাদেশের স্বার্থের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে।
মিয়ানমার ছাড়াও ২০১৯-এর ১৫ আগস্ট আমাদের জাতীয় শোক দিবস, অর্থাত্ বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত দিবসে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস খালেদা জিয়ার ভুয়া এবং ব্যারিস্টার মওদুদের ভাষায় ‘তথাকথিত’ জন্ম দিবসে তাকে উপঢৌকন পাঠিয়ে আমাদের জাতির পিতাকে চরম অবমাননা করেছিল। পরে চীনা রাষ্ট্রদূত জানান, তিনি নাকি জানতেন না খালেদা জিয়ার জন্ম দিবস নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। যদি সে খালেদা জিয়ার জন্মদিনের বিতর্ক সম্পর্কে নাও জেনে থাকেন, সেদিনটি যে আমাদের জাতির পিতার শাহাদাত দিবস সে কথাও কি চীনা দূত জানতেন না? তা-ই যদি হয়, তাহলে তো রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার যোগ্যতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। আর তিনি তো গতকাল এ দেশে আসেননি। এমনকি ২০১৯-এর সেই ঘটনার পর ২০২০ আমলের ১৫ আগস্টও চীনা দূত খালেদা জিয়াকে উপঢৌকন পাঠিয়েছেন। যে কোনো রাষ্ট্রদূত তাদের প্রিয়জনকে বা দলকে উপঢৌকন পাঠাতে পারেন, সেটা আপত্তির নয়। কিন্তু রাষ্ট্রদূত তার স্বাগতিক দেশের শোক দিবসকে অবজ্ঞা বা অবমাননা করলে সেটা নিশ্চয়ই কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত, আর সে কাজটিই চীনা দূতাবাস করছে একাধিকবার।
কয়েক মাস আগে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত কূটনৈতিক সাংবাদিকদের উদ্দেশে হুমকির সুরেই বলেছেন, বাংলাদেশ কোয়াডে যোগ দিলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গত ১৩ মে চীন সরকারের এক মুখপাত্র চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের সমর্থনে কথা বলায় এটা এখন নিশ্চিত হলো যে চীনা দূতের উক্তি মোটেও তার ব্যক্তিগত কথা ছিল না। এটি ছিল চীনের রাষ্ট্রীয় বক্তব্য। শুধু বাংলাদেশেই নয়, চীনা দূতের বক্তব্যের সমালোচনা বাইরেও হয়েছে। কেননা এটাই স্বাভাবিক। একটি সার্বভৌম দেশ কী করবে সে ব্যাপারে বাইরের কোনো দেশ হুমকি দেওয়া তো দূরের কথা, মতামতও দিতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইন তা-ই বলছে। দুটি দেশের মধ্যে আলোচনা এবং যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দূতের ব্যবহার, যাকে অতীতে লিগেশন নামে উল্লেখ করা হতো, অনাদিকাল থেকে প্রচলিত।
প্রথাগত (কোস্টমারি) আন্তর্জাতিক আইন বলছে, কোনো কূটনৈতিক প্রতিনিধি স্বাগতিক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে পারেন না। বিষয়টি পরিষ্কার করতে আন্তর্জাতিক আইনের এক শীর্ষ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ওপেন হাইম তার পুস্তকে লিখেছেন, ‘এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে কূটনীতিকরা অবশ্যই স্বাগতিক দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জীবনে হস্তক্ষেপ করবেন না। সে দেশের রাজনৈতিক স্রোত অবলোকন করা এবং তা নিজ দেশকে জানানোর অধিকার তাদের অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু তাদের কোনো অধিকার নেই স্বাগতিক দেশের রাজনৈতিক জীবনে অংশ নেওয়ার বা কোনো দলকে সমর্থন করার বা হুমকি দেওয়ার। যদি কেউ সে নিয়ম না মানেন, তাহলে সেটি হবে কূটনৈতিক সুযোগের অপব্যবহার।’
প্রথাগত বা কোস্টমারি আন্তর্জাতিক আইন ছাড়াও ১৯৭০ সালের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্রতিটি দেশই অন্য রাষ্ট্রকে হুমকি দেওয়া, সে দেশের জাতীয় সংহতি অথবা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য। তা ছাড়া জাতিসংঘ সনদেও পরিষ্কারভাবে সার্বভৌম সমমর্যাদার নীতির কথা বলা আছে ২ অনুচ্ছেদে। এর অর্থ হচ্ছে কোনো রাষ্ট্রই অন্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর দাদাগিরি চালাতে পারবে না। দেশি আইনে যেমন আইনের চোখে সবাই সমান, আন্তর্জাতিক আইনেও ছোট, বড়, ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে সব দেশ একই কাতারে।
কেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বকে গর্বের বিষয় হিসেবে ব্যক্ত করলেন তার কারণ সম্ভবত এই যে, চীন আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয় প্রচুর ঋণ দিচ্ছে। কিন্তু চীন এসব ঋণ দিচ্ছে এমন সুদের বিনিময়ে, যা অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানের সুদের চেয়ে অনেক বেশি। আর এই সুদের জালে ফেলে যে চীন শ্রীলঙ্কা, জিবুতি, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে ভূমি দখল করেছে, তা তো সারা বিশ্বই জানে, যার কারণে মালদ্বীপসহ বেশ কটি দেশ এবং এমনকি শ্রীলঙ্কাও সতর্ক হয়ে গেছে। এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কা আক্ষেপ করে বলেছে, তাদের হামবানটোটা বন্দরের জন্য ঋণ নিয়ে শ্রীলঙ্কা মারাত্মক ভুল করেছে, যে ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে বন্দরটি ৯৯ বছরের জন্য চীনের মালিকানায় হস্তান্তর করে। উল্লেখ্য, শ্রীলঙ্কার হামবানটোটা বন্দর এতটাই চীনের দখলে যে সেখানে শ্রীলঙ্কার লোকদের প্রবেশও করতে দেওয়া হয় না।
আমাদের সৌভাগ্য বর্তমান দূরদর্শী সরকার এটি টের পেয়ে চীনা ঋণের ফাঁদ এড়িয়ে চলছে। আর এক নতুন কারণ হলো চীন কর্তৃক আমাদের কাছে করোনার টিকা বিক্রয়। এ সময়ে আমাদের করোনা টিকার খুবই প্রয়োজন। তাই চীনের বিক্রি করা টিকা নিশ্চিতভাবে আমাদের জরুরি প্রয়োজন কিছুটা লাঘব করছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, চীন এই টিকা নিয়েও মুনাফা করছে। এর আগে চীন বাংলাদেশে তাদের টিকা পরীক্ষার জন্য আমাদের থেকেই তার খরচ চেয়ে এক অদ্ভুত প্রস্তাব করলে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত যৌক্তিক কারণে তা নাকচ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। যাক এখন আসা যাক শেষ কথায়, অর্থাত্ চীনেরই এখন প্রমাণ করার পালা যে সে আমাদের ভালো বন্ধু। অনাদিকাল থেকে মিয়ানমারের শ্রেষ্ঠতম বন্ধু হচ্ছে চীন। বিদ্রোহের মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর পৃথিবীর প্রায় সব দেশ সেই সরকারের বিরোধিতা করলেও চীন সে সরকারকে কূটনৈতিক, আর্থিক এবং অন্যান্য সাহায্য দিয়ে মিয়ানমারের এই সামরিক সরকারের শ্রেষ্ঠতম বন্ধুর ভূমিকায়। চীন চাইলে সে প্রভাব প্রয়োগ করে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে পারে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে, কেননা চীনের সাহায্য ছাড়া মিয়ানমার নিরুপায়। আরো উল্লেখ্য যে, মিয়ানমার প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা ভঙ্গ করে যাচ্ছে, অথচ সেই মামলার বাদী দেশ গাম্বিয়া কিছুই করতে পারছে না, কেননা আন্তর্জাতিক আদালতের আদেশ ভঙ্গ করার বিরুদ্ধে শুধু নিরাপত্তা পরিষদেই নালিশ করা যায়, আর যত দিন চীন মিয়ানমারের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে তাদের নীতি না পালটাবে, তত দিন মিয়ানমার নিরাপদ।
চীন আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ভঙ্গ করে দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—যার কারণে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ সেই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে চীনের যুদ্ধংদেহি ভাব বিদ্যমান, যে কোনো মুহূর্তেই তাতে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আর চীন পুরো সাগরটি দখলে নিলে এতে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে নিশ্চয়ই, কেননা চীন অবৈধভাবে এ সমুদ্র দখলে নিলে তাতে বাধাপ্রাপ্ত হবে বাংলাদেশসহ সব দেশের বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য ধরনের নৌচলাচল, সাগরের তলদেশের খনিজ সম্পদ থেকে, যেগুলোকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র কনভেনশন ‘মানব জাতির ঐতিহ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছে এবং সমুদ্রের তলদেশে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনার অবাধ অধিকার থেকে।
আমাদের ঋণ দিয়ে চীনই বেশি লাভবান হচ্ছে কেননা তারা যে হারে সুদ নিচ্ছে, অর্থাত্ ৩.১/২, তা বিশ্ববাজারের বিবেচনায় অতি উঁচু। বিশ্বব্যাংক, জাইকা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল এমনকি ভারত থেকে নেওয়া ঋণেও সুদের হার অনেক কম।
সুতরাং এখন চীনের কাছে আমাদের প্রত্যাশা এই যে, দয়া করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রমাণ করুন। এটা করলে বাংলাদেশ আপনাদের বন্ধুত্বে আরো গর্বিত হবে।
n লেখক :আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি
