সোশ্যাল মিডিয়ায় রুচিশীল কনটেন্ট কাম্য

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:১৩

মিডিয়া সমাজের দর্পণস্বরূপ। এই দর্পণে সমাজের সংগতি-অসংগতি ভেসে ওঠে, আলো-অন্ধকার ধরা পড়ে। প্রতিফলিত হয় মানুষের জীবনের বোধ, রুচিবোধ। তবে দর্পণে খাদ সৃষ্টি হলে যেমন অস্বচ্ছ প্রতিবিম্ব তৈরি হয়, তেমনি মিডিয়া অপসংস্কৃতি বা অপব্যক্তি দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকলে তার সৃষ্ট প্রতিফলন অসম্পন্ন রয়ে যায়। এই অসম্পূর্ণতা সমাজের বৃহত্ জনগোষ্ঠীর মনন ও দৃষ্টিভঙ্গিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাতার সংখ্যা নেহাত কম নয়। বিশেষ করে করোনা মহামারিতে লকডাউনের ঘরবন্দি জীবনে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্ পরিসরে ফেসবুক, ইউটিউব এমনকি ওটিটি প্ল্যাটফরমে কনটেন্ট নির্মাণ করে যাচ্ছেন অনেকে। একটি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সংযোগ থাকলেই ঘরে বসে বানিয়ে ফেলা যায় অডিও, ভিডিও বা এনিমেশন কনটেন্ট। এসব কনটেন্ট দর্শকমহলে চলছেও বটে। প্রাথমিক অবস্থায় এমন ব্যাপারকে স্বাগত জানাতে হয়। তবে একটু গভীরে গেলেই চিন্তার ভাঁজ পড়ে যাচ্ছে নেটিজেনদের কপালে। ফেসবুক বা ইউটিউবে যেসব কনটেন্ট নির্মিত হচ্ছে, তার অধিকাংশেরই মান ও রুচি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বারবার। বলে রাখা ভালো, সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে কোনো মানদণ্ড দিয়ে যাচাই-বাছাই করা যুক্তিসংগত নয়। তবে সমাজ-সামাজিকতার বিচারে কিছু কিছু বিষয়কে একেবারে উপেক্ষা করাও যায় না বটে। এসব কনটেন্ট নির্মাতার অধিকাংশই স্কুল-কলেজগামী তরুণ-তরুণী, যাদের এখনো নিজস্ব বা স্বকীয় বোধ জেগে ওঠেনি। ফলে ইন্টারনেটের বদৌলতে খুব সহজেই তারা জড়িয়ে পড়ছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সঙ্গে, যা আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সভ্যতা-সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর প্রভাব এসে পড়ছে তাদের নির্মিত কনটেন্টে। এসব কনটেন্টের কোনো নিবেদন নেই, সৃষ্টিশীলতা নেই, নান্দনিকতা নেই। তবে দর্শকপ্রিয়তা আছে! এখন স্বভাবতই পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, যে জিনিসের কোনো সৌন্দর্য নেই, নির্মাণশৈলী নেই, তার জনপ্রিয়তা কেন? কারণটা হলো, এত এত কুরুচিপূর্ণ, অশ্লীল ও সস্তা বিনোদনমূলক কনটেন্টের ভিড়ে ঠাঁই পাচ্ছে না ‘নান্দনিক’, ‘গঠনমূলক’ ও সৌন্দর্য ধারণকারী সৃষ্টিকর্ম। এমনকি টিভি-সিনেমায়ও পড়েছে এই প্রভাব। ফলে দর্শকদের মধ্যে গড়ে উঠছে না নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের যা-ই দেখানো হচ্ছে, তা-ই গ্রহণ করছে দেদার। আরেকটি বড় কারণ, মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ও নিষিদ্ধ দিকে ধাবিত হওয়ার প্রবণতা বেশি। উঠতি বয়সি তরুণ-তরুণীদের কাছে এসব নেতিবাচক কনটেন্ট দারুণ আকর্ষণের বিষয়। তারা এসবের চর্চা করে যাচ্ছে প্রকাশ্যে এবং গোপনে, যা জাতির ভবিষ্যতের জন্য শোচনীয়। তবে এসবের বিপরীতে যে একেবারেই নিবেদনমূলক ও নান্দনিক নির্মাণশৈলী মেনে কনটেন্ট নির্মিত হচ্ছে না, এমনটা নয়। কিন্তু তা চাপা পড়ে থাকছে ঐ সস্তা বিনোদনের তলাতেই।

একটি সহজ সমীকরণ হলো, বিশ্বায়নের এই যুগে বহির্বিশ্বের কাছে একটি দেশের মানুষের রুচির মাত্রাকে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি বা মিডিয়ার অন্য নিয়ামকসমূহ যতটা না তুলে ধরতে পারছে, তার থেকে অধিকতর ফুটিয়ে তুলছে সেখানকার সাধারণ মানুষের নির্মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে থাকা এসব কনটেন্ট। এই রিপ্রেজেন্টার মাধ্যমগুলোতেই যদি রুচির ঘাটতি থেকে যায়, তবে প্রশ্ন উঠবে জাতিগত বোধ নিয়ে, নষ্ট হবে ভাবমূর্তি। তাই এ ব্যাপারে আলোকপাত করা প্রয়োজন, সচেতনতা জরুরি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা