বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিশীল খাতে বিনিয়োগ করুন

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:২৬

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিশীল ও লাভজনক খাত, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, ব্লু ইকোনমি, পর্যটন ও হাইটেক পার্কের জন্য মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে ভার্চুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে এই আহ্বান জানান তিনি।

ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে ‘বাংলাদেশ ফরওয়ার্ড :দ্য ফ্রন্টিয়ার ফর গ্রোথ’ শীর্ষক ভার্চুয়াল গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। জাতিসংঘের অধিবেশন চলাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লোট নিউ ইয়র্ক প্যালেস হোটেলে অবস্থান করছেন। এখান থেকে তিনি মঙ্গলবার ভার্চুয়াল গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন।

শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অন্যান্য বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো জোরদার হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে আরো উচ্চ পরিসরে উন্নীত করতে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে।

ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের সভাপতি নিশা বিসওয়াল গোলটেবিল পরিচালনা করেন এবং উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশি ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দও এতে অংশ  নেন।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ একটি সঠিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের (এফটিএ) বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি, ব্যাংকিং ও ইনসিওরেন্স খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে অবশ্যই বাংলাদেশে সর্ববৃহত্ বিনিয়োগকারী দেশ। উল্লেখকৃত খাত ছাড়াও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে এফডিআই সুবিধা দিতে বাংলাদেশ অবকাঠামো ও বিদ্যুত্ সরবরাহে উন্নয়ন ঘটাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব অভিন্ন মূল্যবোধ ও স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধিতে আমাদের এই পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি আশা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক অগ্রাধিকারের মাধ্যমেই বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো জোরদার হবে। তিনি বলেন, ২০২৬ সালে এলডিসি অবস্থান থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ও রপ্তানির ভিত্তি বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার প্রয়োজন হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ তার ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের একটি শুধু আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশের ২৮টি হাইটেক পার্কে মার্কিন বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা অব্যাহতভাবে আমাদের আইনি ও আর্থিক অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাচ্ছি এবং পদ্মা সেতু ও ঢাকায় মেট্রোরেলের মতো বিভিন্ন সড়ক ও রেল যোগাযোগও বৃদ্ধি করছি।’

শেখ হাসিনা আরো বলেন, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেরই সবচেয়ে মুক্ত বিনিয়োগনীতি রয়েছে, যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ পার্লামেন্টের আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি দ্বারা সুরক্ষিত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাত সহযোগিতার ফলেই আমাদের বিদ্যুত্ উত্পাদন সক্ষমতা এখন ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এখন আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মার্কিন বিনিয়োগ কামনা করছি।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধিষ্ণু আইসিটি খাত এখন ৬০টি দেশে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি করছে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের আইসিটি পণ্য সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়। ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের আইসিটি শিল্প ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ৬ লক্ষাধিক ফ্রিল্যান্স আইটি প্রফেশনালদের কারণে বাংলাদেশ এখন আইসিটি খাতে বিনিয়োগের জন্য আদর্শ স্থান।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা যেন প্রতিযোগিতামূলক মজুরিতেই দক্ষ জনসম্পদ পেতে পারেন, সেজন্য আমরা জনশক্তিকে দক্ষ করার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছি।’ তিনি বলেন, কোভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনৈতিক উত্তরণের ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির লক্ষ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি। আমাদের দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক সমর্থন রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নীতি গ্রহণের জন্য বিজনেস কাউন্সিল মার্কিন সরকারকে রাজি করাবে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা এই কাউন্সিলকে আমাদের জনগণের জীবনমান উন্নয়নের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছি।’ এডিবি আউটলুক ২০১৯-এর বরাত দিয়ে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দ্রুততম অর্থনৈতিক উন্নয়নের দেশ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এডিবি এই সাফল্যের জন্য বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সুশাসন, সরকারের স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী ম্যাক্রো-ইকোনমিক নীতি ও সঠিক উন্নয়ন প্রাধান্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি বলেন, দ্রুত নগরায়ণ, বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি, দারিদ্র্যের সীমা থেকে উত্তরণ করে ব্যাপক মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে প্রবেশ, বিশাল আঞ্চলিক বাজারগুলোর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি বাংলাদেশকে বিনিয়োগের একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন করছে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’, একটি বঞ্চনা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর স্বপ্ন পূরণ করাই আমাদের সরকারের লক্ষ্য।