সময়ের তালে তালে বিশ্বের প্রতিটি স্থানেই বাড়ছে প্রযুক্তির ব্যবহার। দিন দিন সহজলভ্য হচ্ছে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রী। আর সেই ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পালটে যাচ্ছে সব কাজের ধারা। যোগাযোগ, শিক্ষা, কৃষি, বিদ্যুত্—সবকিছুতেই এখন প্রযুক্তির ছড়াছড়ি। শিল্পকারখানার উত্পাদন প্রক্রিয়ায় এখন যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল নেটওয়ার্কভুক্ত বিভিন্ন মেশিন, যা উত্পাদন প্রক্রিয়াকে আরো নিখুঁত ও সাশ্রয়ী করছে। দাপ্তরিক কাজেও এখন বেশির ভাগ লোক নিজেদের ইলেকট্রনিক সামগ্রী ব্যবহার করছেন। কয়েক বছর আগেও আমরা এসব সহজ প্রযুক্তিগত সুবিধার কথা ভাবতে পারিনি। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য অফিসে একটি এবং বাসায় একটি সিপিইউ আর মনিটর বিশিষ্ট বড় মাপের কম্পিউটার ছিল। কিন্তু এখন প্রযুক্তিগত উন্নয়নের আশীর্বাদে এসব তথ্যপ্রযুক্তি একদিকে যেমন আকার-আকৃতিতে ছোট হয়ে চলেছে, অন্যদিকে মানুষের কেনার সামর্থ্যের মধ্যে চলে আসছে। ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার অধিকাংশ কর্মীর হাতে উঠে এসেছে স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, আইপড, আইপ্যাড, ই-বুক কিংবা ই-রিডারের মতো সহজ ইলেকট্রনিক সামগ্রী।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ এখন দাপ্তরিক কাজের সময়েও নিজেদের এসব ব্যক্তিগত ই-সামগ্রী ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানও এই প্রবণতা থেকে লাভবান হচ্ছে। তাই এখন দাপ্তরিক কাজে এসব ই-সামগ্রী ব্যবহারে আর কোনো বাধা না দিয়ে উত্সাহিত করা হচ্ছে কর্মীদের। আমেরিকান মার্কেট রিসার্চ কোম্পানি ‘ফরেস্টার রিসার্চ’ নামক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভোক্তা প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষক টেড শাডল্যার বলেন, ২০০৮ সালে অ্যাপল যখন তাদের মোবাইল ফোনে ইমেইল ও ওয়েবসাইট ব্যবহারের সুবিধা চালু করে, তখন থেকেই এই প্রবণতার উত্থান। এখন তো প্রযুক্তি আরো অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে প্রযুক্তির সব সামগ্রী। আমরা ভোগ করছি সহজ ও আরামদায়ক বিভিন্ন সুবিধা।
‘ফরেস্টার রিসার্চ’-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকেরও বেশি জনশক্তি দাপ্তরিক কাজে নিজের ফোনটি ব্যবহার করেন। এতে দাপ্তরিক কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করা বেশ সহজসাধ্য হয়। আমাদের দেশেও বিভিন্ন ধরনের কাজে প্রযুক্তিগত ব্যবহার বাড়ছে। প্রযুক্তিগত প্রবণতা বৃদ্ধির ফলে এখন পেশাগত এবং পারিবারিক জীবনের মধ্যে ব্যবধান কমে আসছে। এটিকে এখন আর নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে না। অন্যদিকে, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়েও এর ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। প্রযুক্তি আজ আমাদের কোথায় নিয়ে গিয়েছে, তা ভাবতে সত্যিই অবাক লাগে। কোথায় নেই প্রযুক্তি? প্রযুক্তির নানা ব্যবহারে আজ বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রার মান। তবে প্রযুক্তির কারণে জীবনযাত্রা পরিবর্তনের এই ধারা কখনো ইতিবাচক, আবার কখনো নেতিবাচক—যা নির্ভর করে ব্যবহারকারীর মানসিকতার ওপর।
এবার প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের প্রসঙ্গে আসি। যদি প্রশ্ন করা হয়—রাতে বিছানায় শুয়ে-বসে ফেসবুক, টুইটারের জগতে আপনার আনাগোনা কি দিনে দিনে বাড়ছে? প্রযুক্তির তালে তাল মেলাতে গিয়ে জীবনের স্বাদ থেকে কি বঞ্চিত হচ্ছেন? উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে এর পরিণাম শুভ হবে না। যুক্তরাজ্যের ১৫ হাজার মানুষের ওপর এক সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, প্রযুক্তির কোপে তাদের যৌনজীবনে ছন্দপতন ঘটছে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ক্যাথ মার্সার বলেন, ‘বর্তমান প্রতিযোগিতার বাজারে সাধারণ মানুষ এমনিতেই মানসিক চাপে থাকেন। চাকরি, রোজগার—এসব নিয়ে চিন্তার শেষ নেই।’ সমীক্ষাটি সামনে রেখে মার্সারের মন্তব্য, ‘আধুনিক প্রযুক্তিকে আমরা টেনে বিছানায় আনছি। ল্যাপটপ, ট্যাবলেট খুললেই ফেসবুক, টুইটারের জগত্। মানসিক চাপ কাটাতে যৌনসঙ্গীর কোনো বিকল্প নেই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা প্রযুক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করছি। বিছানায় প্রযুক্তির অনুপ্রবেশের ফলে দেখা যাচ্ছে, ১৬ থেকে ৪৪ বছরের যুগলরা অনলাইন পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এটি বেডরুমে প্রযুক্তির অবাধ প্রবেশের ফল।’
ব্রিটেনের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লুই থিওডোসিও বলেন, ‘দু-তিন বছর আগেও তার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাঝখানে কোনো শিশু তাদের ফোন ব্যবহার করছে বা টেক্সট করছে—এমন ঘটনা ছিল খুবই অস্বাভাবিক। কিন্তু এখন এটা খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। শিশুরা তাদের ফোন নিয়ে খুব বেশি সময় কাটাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে টিনএজাররা বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা বা অন্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। আর এমন কেসের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। এসব শিশু-কিশোর এক কল্পনার জগতে বাস করছে, এতে তাদের শারীরিক স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘অভিভাবকদের জন্য পরিস্থিতি খুব কঠিন হয়ে গেছে। তিনি এমন অভিভাবকের কথাও শুনেছেন, যারা ওয়াইফাই রাউটার নিজেদের সঙ্গে নিয়ে ঘুমান, যাতে সন্তানরা মাঝরাতে উঠে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না পারে।
প্রযুক্তির ইতিবাচক দিক হলো, বর্তমান জীবনধারায় কেউ আর একা নন। কারণ, সঙ্গী হিসেবে আছে ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম! সমীক্ষায় দেখা গেছে, অনেকেই একা থাকতে পছন্দ করেন। তার মানে এই নয় যে, যৌনতার প্রতি তাদের কোনো আকর্ষণ নেই। কেননা, ইন্টারনেটের মধ্যে যৌনতার স্বাদ তাদের অনেকেই নেন। কিন্তু যৌনসঙ্গীতে তীব্র আপত্তি। এর ফলে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগও কমছে। কমছে সংসার পাতার প্রবণতাও। সমীক্ষাটি ব্রিটেনের হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে ফলাফল খুব বেশি হেরফের হওয়ার সম্ভাবনা কম। কেননা, উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে প্রযুক্তির অগ্রগতি কমবেশি একই; আর্থসামাজিক মাপকাঠিতেও বিশাল পার্থক্য নেই।
সময়ের তালে তালে বিশ্বের প্রতিটি স্থানে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েই চলেছে। প্রযুক্তির এই ব্যবহার আমাদের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ করে দিয়েছে, তেধমনি অজানা এক চিন্তার মধ্যেও সবাইকে থাকতে হচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের স্বস্তি দিলেও শঙ্কা থেকে আমরা কোনোভাবেই মুক্ত হতে পারছি না। এটা পরিষ্কার এবং অনস্বীকার্য যে, প্রযুক্তির কারণে মানুষের জীবনযাত্রা পরিবর্তনের ধারা কখনো ইতিবাচক, আবার কখনো নেতিবাচক হয়ে উঠছে। অবশ্য এর পুরোটাই নির্ভর করে ব্যবহারকারীর মানসিকতার ওপর, তার আসক্তির ওপর। তাই আমরা যদি প্রযুক্তির ভালোটাকে গ্রহণ করে খারাপটাকে বর্জন করতে পারি, তাহলেই হবে প্রযুক্তির সার্থকতা—প্রযুক্তির জয়।
n লেখক : প্রাবন্ধিক
