তাঁর ৮০তম জন্মদিনের প্রাক-মুহূর্তে ইত্তেফাকের আমন্ত্রণে একটি দীর্ঘ সাক্ষাত্কার নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। আগেই বলে রেখেছিলাম, গত্বাঁধা প্রশ্নোত্তর নয়, বরং তিনি যে ঊনআশি বছর পৃথিবীতে কাটিয়ে এলেন এবং ষাট বছরের বেশি সময় ধরে শিল্প-সংস্কৃতির প্রায় সব মাধ্যমে পথ হাঁটলেন এবং জীবনের প্রাণ-প্রাচুর্য-বিস্তার দেখলেন—এর মধ্য দিয়ে তাঁর যে অভিজ্ঞতা ও জীবনবেদ—সেসব শুনব। সানন্দে রাজি হয়েছিলেন; আমাদের আলাপচারিতা খুবই সার্থক হয়েছিল। নিজেও বিপুলভাবে ঋদ্ধ হয়েছি। কারণ বাংলাদেশ, উপমহাদেশ এবং বিশ্বের সবচে ঘটনাবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ভেতর দিয়ে সৈয়দ শামসুল হক জীবন পাড়ি দিয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর মতো জটিল, বিস্ময়কর, ঘটন-অঘটনের সময়ে অন্তত ছয়টি দশক সজ্ঞান ও সক্রিয়ভাবে কাটিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গে বিপুল পঠন, ভ্রমণ ও চিন্তন। একজন সৃজনশীল মানুষের নিজেরও তো আলাদা একটি সমান্তরাল পৃথিবী তৈরি হয় এবং বাস্তব ও কল্পপৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি একটি সেতুর ভূমিকা পালন করেন। এ কাজটি সৈয়দ হক বহু মাত্রা ও মাধ্যমে এতভাবে করেছেন যে, তার নেপথ্যকাহিনিও গভীর তাত্পর্যময়।
তাই জানতে চেয়েছিলাম তাঁর জীবনদর্শন।
কথা হচ্ছিল তাঁর গুলশানের সুদৃশ্য-সবুজ ‘মঞ্জুবাড়ি’র বসার ঘরে।
অকপটে বললেন :“আমাকে দেখে হয়তো অনেকে ভাবেন—আমি এখন যেমন আছি, হয়তো সবসময় তেমনি ছিলাম। আসলে আমার জন্ম খড়ে-ছাওয়া একটি কুটিরে, নদীর পাড়ে। আবার বাবা খুব পরিশ্রম করে নিম্নমধ্যবিত্তর পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। কুড়িগ্রামে যে ঘরে আমরা থাকতাম তার চালে টিন থাকলেও বেড়া ছিল বাঁশের, মেঝে ছিল মাটির। বাবা মাঝে মাঝে আমাকে উচ্চাশা দিতেন—‘মনে রেখো পুত্র, তোমাকে ইটের দালানের দিকে পৌঁছুতে হবে।’ এটা একটা প্রতীক। এই বাড়িটা যখন শুরু করি, প্রথম ভিত স্থাপন করতে যাই, তখন বাবার কথাটা খুব মনে পড়েছিল। বাবা হঠাত্ চলে গেলেন, আমার আঠারো বছর বয়সে। তাই অনেক কষ্ট করেই বড় হয়েছি। সাত-সাতটা ভাইবোন ছিলাম, যা পেয়েছি তা পরিবারের সবাই মিলে ভাগ করে খেয়েছি। তবে ঝুঁকি যেমন ছিল, তেমনি আমার ভেতর জেদও ছিল। ভেবেছি—হবে না কেন, অবশ্যই হবে। কখনো হাল ছেড়ে দিইনি। তুমুল নিরাশার সময়ও আশাকে বিদায় করিনি। আমি সব সময় নিজের জীবনকে ভেতর থেকে যেমন দেখি, তেমনি বাহির থেকেও দেখি। আমার অনেক কঠিন সময়ে নিজেকেই নিজে দর্শক হিসেবে দেখেছি, যেন এসব ঘটনা আমার জীবনে ঘটেনি। আর নিজেকে নিরাসক্তভাবে বাইরে থেকে দেখা একজন লেখকের জন্য জরুরি। আমার মধ্যে একটা নিরাসক্তি আছে। আমি কখনো কোনো কিছু নিয়েই অনুতাপ করিনি।”
এই যে বাবার বলা, ‘তোমাকে ইটের দালানের দিকে পৌঁছুতে হবে।’ তারপর ‘অনেক কষ্ট করে বড় হওয়া’, জীবনে অনেক ‘ঝুঁকি’ থাকা সত্ত্বেও ‘ভেতরে জেদ’ থাকা, ‘হাল না ছেড়ে দেওয়া’ এবং ‘তুমুল নিরাশার সময়ও আশাকে বিদায় না করা’—এ-ই তো সৈয়দ শামসুল হক।
আর তৃতীয় বিশ্বের এক দরিদ্রতম ও পরাধীন দেশে পিছিয়ে পড়া এক জনগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে যাঁর জন্ম, যাদের স্বাজাত্যবোধ মাত্র জন্ম নিচ্ছে, ‘আধুনিক’ শিক্ষার ক্ষেত্রে যারা প্রথম কি দ্বিতীয় প্রজন্ম, কেবল স্বপ্ন ও আশা যাদের প্রধান ভরসা, সে রকম জায়গা থেকে উঠে আসার লড়াইটা কী প্রচণ্ড, আমরা যারা স্বাধীন দেশে জন্ম নিয়েছি, তাদের পক্ষে বুঝে ওঠা বেশ কঠিন। এই দীর্ঘ পথ মাড়িয়েই তো তিনি আজকের সৈয়দ হক। ফলে তাঁর জীবনের বোধ ও পিপাসা যে তীব্র হবে এ-ই তো স্বাভাবিক। বললেনও নিজেই, ‘এই যে সময়টা পার করে এলাম, তাকিয়ে দেখি এটা খুবই উত্তেজক, উদ্বোধক, নাটকীয়, সংঘাতপূর্ণ... এই সময়টা আমাকে এমনভাবে নিয়ে এসেছে, মরে যদি আবার জন্ম হয়, তাহলে এমনভাবেই আসতে চাইব, এই জীবনই চাইব।’ তাই আশিতে পৌঁছেও তিনিই বলতে পারেন, ‘এখনো মনে হচ্ছে না যে, হাল ছেড়ে দেবার সময় এসেছে বা বসে পড়বার জন্য ডাক এসেছে। আগের মতোই তো আছি।’ এই মানুষই তো তাঁর আত্মজীবনীর নাম দিতে পারেন, ‘প্রণীত জীবন’। জৈবিক কারণের বাইরে এ জীবনের প্রণেতা তো তিনি স্বয়ং! নিজের ঘাম-শ্রম-রক্ত, স্বপ্ন ও সাধনা দিয়ে প্রণীত!
জীবনের প্রায়-প্রতিটি মুহূর্তে শরীরে ও মনে শিল্পিত থাকা, মগজে কিংবা কলমে নিয়ত সৃষ্টি করার এক আশ্চর্য সহজাত ক্ষমতা, না ‘সহজাত’ বোধহয় ভুল, বরং বলা যাক অর্জিত ক্ষমতা (কারণ এর জন্য তাঁর সজ্ঞান ও শ্রমশীল অনুশীলন রয়েছে)। খুব বিস্মিত হয়েছিলাম তাঁর কথা শুনে যে, ‘আমি আমার জীবনের সবচে কঠিন মুহূর্তেও সকালে কখনো গোসল না করে এবং ভালো পোশাক-আশাক না পরে লিখতে বসিনি। কোনোদিন লুঙ্গি পরে বা হেলাফেলা করে লিখিনি। শীত বা গ্রীষ্ম, দেশ কিংবা বাইরে সব অবস্থায় আমি এই রুটিন মেনে চলি।’ এ কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে বলতেই হয় সৃজন তাঁর কাছে প্রার্থনার মতো। এবং এই সাধনা অন্যভাবে শেষ রোগশয্যায় শুয়েও করছেন। সৃজনকে ঘিরে কেমন তাঁর ‘অলৌকিক আনন্দ’, তাঁর মুখেই শুনি : ‘লিখেই আমি সর্বোচ্চ আনন্দ পাই।...কাজটা করতেই খুব আনন্দ। এমনকি লেখার টেবিলে বসার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হয় আমি একটি আনন্দের দরোজায় দাঁড়িয়েছি, এবার আমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে হবে।...আমি লেখাটাকে প্রচণ্ড এনজয় করি।’
এর পরেই যোগ করলেন : ‘ইউ নো, মাই রাইটিংস অ্যান্ড মি, ইটস রিলেটেড টু ইচ আদার...।’ বললেন, ‘মূলত আমি মিস্ত্রি তো। ধরো এখানে কিছু কাঠ আছে বা কিছু কাঠের টুকরো পড়ে আছে—কিছু তো বানাতে হবে। কারণ হাত তো নিশপিশ করে।’
মনে পড়ে আইনস্টাইনের সেই উক্তিটা—‘আমার কাছে প্রতিভার মানে হচ্ছে পরিশ্রম।’ কাজেই আমরা যারা প্রতিভা ধুয়ে পানি খাই কিংবা বিনাশ্রমে ‘মৌলিক সৃষ্টি’ নামে অনেক সময় সাহিত্যবর্জ্য উত্পাদন করি, কথাটা তাদের কাছে বেদনাদায়কই মনে হতে পারে। কিন্তু শিল্পীর কাজ তো অনেকটাই মিস্ত্রির মতো, ক্রাফটম্যানশিপ, প্রতিভার জোরে ভেতর থেকে কিছু এলেও তাকে কি হুবহু ছেড়ে দেওয়া যায়, কারুকাজহীন? জীবনানন্দের কবিতার পাণ্ডুলিপিতে অজস্র কাটাকুটি দেখলেই টের পাওয়া যায়, একটি খসড়া কবিতা যেন টুকরো কাঠ বা পাথর, আর তাকেই তিনি করে তুলেছেন অসামান্য ভাস্কর্য। সৈয়দ হক এই শ্রমঘন মিস্ত্রিগিরি করেছেন বলেই তাঁর রচনা বিপুল ও বহুবর্ণিল।
তিনি আধুনিক, অন্তহীন জীবনপিপাসু, চিরতরুণ প্রাণ!
যে অগণন বাঙালি ঝড়ে-ঝঞ্ঝায়-বন্যায়-আগুনে নিঃশেষ হতে হতেও ঘুরে দাঁড়ায়, তিনি যেন সেই জাতির সুযোগ্য আধুনিক উত্তরাধিকার। তাঁর সৃষ্টিবিশ্বে তো এই সাহসের কথাই উচ্চারিত হয়েছে বারবার। এ জাতির প্রেম-যৌবন-স্বপ্ন-সংগ্রামকেই তো তীব্র তারুণ্যে তিনি পরানের গহিন ভিতর থেকে তুলে এনেছেন। এ যৌবনের উত্স কোথায়? বললেন : ‘জীবনকে আমি ভালোবাসি। প্রতি মুহূর্তে জীবনকে উপভোগ করতে চাই। এই তাড়না এবং প্রেরণা আমাকে অক্ষয় যৌবনে রেখেছে এটা তোমরা বলতে পারো। কিন্তু আমি মনে করি এটা আমাকে সপ্রাণ রেখেছে।’
তিনি সর্বার্থেই একজন আধুনিক মানুষ। আর আমরা তো জানি, আধুনিক মানুষ একইসঙ্গে বীর ও ভাঁড়, ভোগী ও ত্যাগী, সাহসী ও পলায়নপর, প্রেমিক ও কামুক, সুস্থ ও বিকারগ্রস্ত, নির্লিপ্ত ও সুযোগসন্ধানী। তার আছে নানান ছদ্মবেশ ও মুখোশ, আলো ও আঁধার...। বিশ শতকের গোড়াতেই তো দস্তয়েভস্কি দেখিয়ে দিয়েছেন, মানুষের ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ ভালো বা মন্দ বলে কিছু নেই। তার ভিতর দেবতা ও শয়তান জড়াজড়ি করে আছে, যাকে আলাদা করা খুব কঠিন। আর নিশ্চয়ই মনে আছে ড. জেকিল আর মিস্টার হাইডের সেই গল্পটা, যেখানে দিনে যিনি পরম সাধু ও সজ্জন, রাতে তিনিই ভয়ংকর খুনি?
তিনি যে এত তীব্র নিবেদন নিয়ে সৃজনের পথ হেঁটে গেলেন, তাঁর সমূহ সীমাবদ্ধতাসমেত, সেজন্য তাঁকে সত্তার গহিন থেকে অভিনন্দিত করি।
