লাল মোরগ

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:৩৫

আমিন সাহেব বাজারে যান না। বাড়ির বুয়া কুলসুমই বাজারসওদা করে। আজ সকালে হঠাত্ কী মনে হলো তিনিই জানেন। কুলসুমকে ডেকে বললেন আজ তিনি বাজারে যাবেন। কুলসুম বাজারের থলেটা তার হাতে দিয়ে বেশ অবাক হয়ে তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকল।  

সবজি কেনা শেষ করে আমিন সাহেব মুরগির বাজারে ঢুকেছেন। একটা মুরগি কিনতে হবে।

স্যার, এই দিকে আসেন। দেশি মুরগি আছে। তিনি দেখলেন কাছেই একজন মুরগিওয়ালা খাঁচার ওপর মুখ বের করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে মেহেদি মাখানো দাড়ি, ঠোঁটে বিনয়ের হাসি। আমিন সাহেব দাঁড়ালেন। খাঁচার ভেতর বেশ ক’টি মোরগমুরগি। বোধহয় তখনই খাবার দেওয়া হয়েছে। মোরগমুরগিগুলো থালার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। ধাক্কাধাক্কি করে খাবার খাচ্ছে।

মোরগ না মুরগি দেবো? দোকানি জিজ্ঞাসা করল।

মোরগ হলে ভালো, আমিন সাহেব বললেন। মোরগমুরগিগুলোর ভিড়ে বেশ বড়সড়, বেশ হূষ্টপুষ্ট একটা লাল মোরগ ঠোঁট দিয়ে ঠক্ ঠক্ শব্দ করে খাবার খাচ্ছে। আমিন সাহেবের চোখ পড়ল মোরগটার ওপর। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে দোকানি খপ করে মোরগটাকে ধরে খাঁচা থেকে টেনে বার করে আনল। মোরগটা ডানা ঝাপটাচ্ছ আর তীক্ষ গলায় চিত্কার করছে।

ওজন নেওয়া হলে একটা ছুরি হাতে নিয়ে সহকারী ছেলেটাকে ডাকল দোকানি। আমিন সাহেব মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালেন। তিনি নরম দিলের মানুষ। রক্তপাত দেখতে পারেন না। রক্ত দেখলে বমির ভাব হয়। মোরগটার চিত্কার সহসাই থেমে গেল। জবাই করা মুরগিটা একটা ড্রামের ভেতর ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। ড্রামের ভেতর থেকে পাখা ঝাপটানোর শব্দ আসছে। আমিন সাহেব মনে মনে দারুণ অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। খুব খারাপ লাগছে। মোরগটা বোধহয় ক্ষুধার্ত ছিল, খাবার খাচ্ছিল। সেই অবস্থায় তাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে জবাই করাটা খুবই অমানবিক কাজ হয়েছে। তিনি মোরগটার ওপর চোখ না ফেললে হয়তো প্রাণীটাকে এভাবে মরতে হতো না। মোরগটার এই পরিণতির জন্য নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হচ্ছে তার। তিনি ম্লান মুখে মুরগিওয়ালার দিকে তাাকালেন। সে নির্বিকার মুখে পান চিবোচ্ছে। মাসুম, স্যারের মুরগিটা বানায়া দে, বলে একপাশে কাত হয়ে সে পানের পিক ফেলল।

ছেলেটির দিকে তাকালেন আমিন সাহেব। রয়স দশের মতো হবে। সেই অর্থে মাসুমই তো। ছেলেটি মোরগের চামড়া ছাড়াতে লেগেছে। মোরগটা এখনো প্রাণে মরেনি। থেকে থেকে ডানা নাড়ছে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই ছেলেটির। মোরগের পাখাদুটো মুঠোয় চেপে নিবিষ্ট মনে টেনে টেনে চামড়া ছিঁড়ছে। চামড়া ছাড়ানো হলে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে মোরগের পা দুটো আলাদা করল সে, তারপর মাথাটা। ছেলেটির দুটো হাত রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। আমিন সাহেব সেদিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। তিনি মুরগিটা থলেতে ভরে তাড়াতাড়ি বাজার থেকে বেরিয়ে এলেন।

মুরগি কেমনে রানবাম। ঝোল, না আলু দিবাম? বারান্দায় চেয়ারে ঝিম মেরে বসে ছিলেন আমিন সাহেব। কুলসুমের কথায় মুখ তুলে তাকালেন। বেশ বিরক্তি বোধ করলেন তিনি। মেজাজি গলায় বললেন, মুরগি রাঁধতে হবে না, ফ্রিজে তুলে রাখো। আজ অন্য কিছু রাঁধো। সাহেবের হঠাত্ এরকম চড়া মেজাজের কারণ বুঝতে না পেরে কুলসুম কাচুমাচু মুখ করে রান্নাঘরের দিকে গেল। আমিন সাহেবের মনটা ভালো নেই। তিনি লাল মোরগটার কথা ভাবছেন। তার ইঙ্গিতেই যে মোরগটাকে প্রাণ হারাতে হয়েছে এরকম একটা অনুশোচনাবোধ তাকে কাতর করে তুলছে। তার খুব কষ্ট লাগছে। কিছু কষ্ট আছে যা মন থেকে তাড়ানো য়ায় না। সেই কষ্টের কথা কাউকে বলা যায় না। সে রকম একটা কষ্টের বোঝা বুকে নিয়ে আমিন সাহেব আচ্ছন্ন হয়ে থাকলেন।

দুপুরবেলা বাড়িটা নিঝুম হয়ে গেছে। আমিন সাহেব বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিলেন। এমন সময় খাবার ঘরের দিক থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ তার কানে বিঁধলে তিনি সচকিতভাবে বিছানা থেকে নামলেন। শব্দটা যেন পরিচিত। যেন ঠোঁট দিয়ে খট্খট্ শব্দ করে একটা মুরগি খাবার খাচ্ছে। পায়ে পায়ে খারার ঘরে এলেন তিনি। ঘরে কেউ নেই। মনে হচ্ছে শব্দটা ফ্রিজের ভিতর থেকে আসছে। তিনি কাঁপা হাতে ফ্রিজের দরোজা খুলে হতভম্ব হয়ে গেলেন। ফ্রিজের ভেতর একটা জলজ্যান্ত লাল মোরগ দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখা মাত্র মোরগটা ঘাড় বাঁকিয়ে তীক্ষ চিত্কার করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মোরগটা ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ধারালো ঠোঁট দিয়ে তার চোখেমুখে ঠোকর দিচ্ছে। আমিন সাহেব আতঙ্কে চিত্কার করে উঠলেন। চিত্কার শুনে কুলসুম ছুটে এল। আমিন সাহেব হতবিহ্বল চোখে তাকিয়ে আছেন। তিনি আর কুলসুম ছাড়া ঘরে আর কেউ নেই। ফ্রিজের দরোজাটা খোলা। ভেতরে চামড়া ছাড়ানো মোরগটা দেখা যাচ্ছে।

কী হইছে খালু? বিস্মিত চোখে কুলসুম জিজ্ঞাসা করল। কিছু হয় নাই, বলে শ্লথ পায়ে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে গেলেন তিনি।

সেদিন পার্কে হাঁটা শেষে আমিন সাহেব বাড়ি ফিরছেন। একটা লাল মোরগ গলির মোড়ে ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট থেকে খুটে খুটে কিছু খাচ্ছে। কাছে আসতেই মোরগটা গলা উঁচু করে তার দিকে তাকাল। তারপর গলা কাঁপিয়ে একধরনের তীক্ষ কক্ ক্ক শব্দ করে ডেকে উঠল। আমিন সাহেবের মনে হলো মোরগটা এখনি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। গলির রাস্তা ভীষণ ফাঁকা। আমিন সাহেব খুব ভয় পেয়েছেন। তিনি পেছনে না তাকিয়ে দ্রুত পা ফেলে বাড়ির দিকে ছুটলেন।

কুলসুম বারান্দায় ফুলগাছের টবে পানি দিচ্ছিল। আমিন সাহেবকে হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি টপকে বারান্দায় উঠতে দেখে অবাক চোখে তাকাল। সাহেবের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ।

খালু, এমুন লোড় ফারতাছেন ক্যান? কী অইছে?

কিছু হয় নাই, বলে পকেট থেকে রুমাল বের করে তিনি কপালের ঘাম মুছলেন তারপর গেটের দিকে তাকালেন। তার দুই চোখে সংশয়। গেটের বাইরে গলির রাস্তাটা বেশ অনেকদূর পর্যন্ত ফাঁকা, যাত্রী নিয়ে একটা রিকশা আসছে। আর কিছু দেখা যাচ্ছে না।  লাল মোরগটাকেও দেখা গেল না। তাকে রাস্তার দিকে তাকাতে দেখে কুলসুম ঘাড় কাত করে সেদিকে তাকাল। কিছু দেখতে না পেয়ে আবার জিজ্ঞাসা করল, খালু, কী হইছে?

বললাম তো, কিছু হয় নাই। বিরক্তির সুরে বললেন তিনি। তারপর ক্লান্ত পায়ে বসার ঘরে ঢুকে সোফায় শরীর এলিয়ে দিলেন। আমিন সাহেব আজকাল লাল মোরগকে ভীষণ ভয় পান। তবে সে কথা কাউকে বলতে পারেন না।