আমাদের সংবিধানের ২৭ নম্বর ধারায় বলা হইয়াছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী। আবার আমরা বলিয়া থাকি, কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নহে; কিন্তু এই সকল সাংবিধানিক ও নীতিবাক্যের ব্যত্যয় বহু ক্ষেত্রেই ঘটিয়া চলিয়াছে। ইত্তেফাকের খবরে বলা হইয়াছে, বরিশাল-ভোলা-মেহেন্দিগঞ্জ নৌপথে চলিতেছে শত শত অবৈধ স্পিডবোট। অনুমোদন আছে মাত্র আটটির; কিন্তু চলিতেছে দেড় শতাধিক। অনুমোদন না লইয়াই যদি স্পিডবোট চলিতে পারে, তাহা হইলে অনুমোদন নেওয়ার দরকার কী? নৌপথে ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ। এই যানবাহনের বড় সীমাবদ্ধতা হইল, ইহার ব্যাক গিয়ার নাই, অর্থাত্ পিছনে যাইতে পারে না। নৌপথে বহু দুর্ঘটনার জন্য দায়ী এই যানবাহন; কিন্তু আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করিয়া এই যান চলাচল ঠিকই অব্যাহত রহিয়াছে। এইরূপ যানবাহন যাহারা চালাইতেছেন এবং প্রশাসনের যাহারা সকল কিছু দেখিয়াও না দেখিবার ভান করিতেছেন, তাহাদের শুভবুদ্ধির উদয় হইবে কবে?
আইন আসলে মানা হইতেছে কোথায়—তাহাও একটি বড় প্রশ্ন। লঞ্চের ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকাটা বাধ্যতামূলক; কিন্তু ফিটনেস সার্টিফিকেট নাই এমন লঞ্চও চলিতেছে অহরহ। এই সকল ক্ষেত্রে প্রশাসনকে ম্যানেজ করা যেন কোনো ব্যাপারই নহে। অবৈধ স্পিডবোট হইতে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের চাঁদা তোলা হয়। এই চাঁদার লোভই নিয়মকে অনিয়মে পরিণত করিয়াছে। এই সকল স্পিডবোটের অধিকাংশই জরাজীর্ণ, ফাটা ও জোড়াতালি দেওয়া। পথিমধ্যে পানি উঠিয়া ও ইঞ্জিন বিকল হইয়া অনেক সময় আগুন ধরিয়া যায়। অনেক স্পিডবোটের সার্ভে সনদ, রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট নাই। তদুপরি দিব্যি চলিতেছে, তাহাও আবার বেপরোয়া গতিতে। অনেক সময় জেলেদের মাছ ধরিবার জাল ছিন্ন করিয়া অবাধে চলিতেছে। ইহাতে অনেক সময় ঘটিতেছে দুর্ঘটনা এবং মানুষ আরামদায়ক ও স্বল্প খরচের নৌপথে চলাচল করিতে এখন ভয় পাইতেছে। অবৈধভাবে চলাচলকারী এই সকল স্পিডবোট বন্ধে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে চিঠি দিয়াছে বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ। তবে শুধু চিঠি দিলেই চলিবে না, নিয়মিত মনিটরিং ও অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। নৌযানে অতিরিক্ত ভাড়া, ধারণক্ষমতার অধিক লোক লওয়া, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট না থাকা, লঞ্চের ছাদে লোক লওয়া, নৌপথে প্রয়োজনীয় সাইন-সিম্বল না থাকা ইত্যাদি অনিয়ম ও সমস্যা দূর করিতে হইবে।
এই দেশে শুধু নৌপথে যে নিয়ম না মানিবার দৃষ্টান্ত তৈরি হইয়াছে তাহা নহে। স্থল বা সড়কপথেও কি নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে? নছিমন, করিমন, ভটভটি ইত্যাদি যানবাহনও নিয়ম না মানিয়া মহাসড়ক দিয়া চলিতেছে বহুদিন ধরিয়া। মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনার পিছনে এই সকল যানবাহন বহুলাংশে দায়ী। এই সকল যানবাহনের অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি বিদ্যমান। দ্রুতগতির যানবাহনের সহিত যখন কম গতির যানবাহন একই লেনে চলাচল করে, তখন দুর্ঘটনা ঘটাটাই স্বাভাবিক। কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করিয়া বাসে বাসে সংঘর্ষ ও ধাক্কাধাক্কি যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। অধিকাংশ বাসের গায়ে এই জন্য আঁচড় ও সংঘর্ষের ক্ষতচিহ্ন দেখা যায়। রুট পারমিট পাওয়ার পরও ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হয় (যেমন—গেটপাশ, বিভিন্ন সমিতির চাঁদা, ট্রাফিক পুলিশের ‘পথ খরচ’ ইত্যাদি)। এই চাঁদাবাণিজ্যের কারণে ‘প্রশ্রয়’ পাওয়া বাসমালিক-চালকেরা কোনো নিয়ম মানিতে চাহেন না। ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ফিটনেস সার্টিফিকেট এমনকি সড়ক দুর্ঘটনাকেও তাহারা পরোয়া করেন না। তাই একই অপরাধ বারংবার সংঘটিত হইতেছে।
এইভাবে নৌ, সড়ক, বিমান—যেই পথের কথাই বলি না কেন, সর্বত্র নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। তৃতীয় বিশ্ব বা উন্নয়নশীল দেশসমূহের প্রধান সমস্যাই হইল নিয়মতান্ত্রিকতার পথ অনুসরণ না করা। আইন ও নিয়মের ব্যত্যয়ে যে অরাজকতামূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহা হইতে আমাদের অবশ্যই বাহির হইয়া আসিতে হইবে।
