ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ তার দলের রাজ্য সভাপতির পদটি খুইয়েছেন। যদিও পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিজেপির সর্বভারতীয় সহসভাপতির পদে বসানো হয়েছে তাকে। কিন্তু রাজনৈতিক মহল মনে করছে, একুশের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দেখার পর থেকে পদ্ম শিবিরে যে ভাঙন শুরু হয়েছিল তার স্রোত যেন প্রতিদিন বাড়ছে। ভাঙন কেবল রাজ্য স্তরেই সীমাবদ্ধ নয়, পাশাপাশি জেলা স্তরেও বিজেপির ঘর ভাঙছে। বিজেপির ছোট-বড় বহু নেতাকর্মীই পদ্ম শিবির ছেড়ে চলে যাচ্ছেন জোড়াফুলে। অন্যদিকে, দিলীপ ঘোষের কথাবার্তা নিয়েও দলের একাংশ কিছুকাল ধরেই আপত্তি তুলেছিলেন। তাদের অনেকের মতে, দিলীপ ঘোষের একের পর এক বক্তব্যে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই এ রাজ্যে বিজেপি এখনো পর্যন্ত শিক্ষিত সমাজের সমর্থন আদায় করতে সমর্থ হয়নি।
প্রসঙ্গত একুশের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের আগে নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই রাজ্য তথা জেলায় জেলায় বিজেপির অন্দরেই গড়ে উঠেছিল দুটি সমান্তরাল গোষ্ঠী। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দিলীপ ঘোষের রাজ্য সভাপতির পদের আয়ু ছিল আরো কয়েক মাস। তার আগেই জেলার একটা অংশের বহু কর্মীরাই ধীরে ধীরে হলেও গেরুয়া শিবির ছাড়তে শুরু করেছিল। কেউ কেউ আবার অবস্থা বুঝে মধ্যপন্থি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এবার হয়তো সেই অংশ সক্রিয় হয়ে উঠবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এদিকে আর কিছুদিনের মধ্যেই ভবানীপুর বিধানসভাকেন্দ্রে উপনির্বাচন। অন্যদিকে ৪ অক্টোবর মানস ভুইঞার ছেড়ে যাওয়া রাজ্যসভার আসনে উপনির্বাচন। তৃণমূল আগেই প্রার্থী নাম জানিয়ে দিয়েছিল। এবার সেই আসনে প্রার্থী দেবে না বিজেপি, টুইটে এমনটাই জানিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি টুইটারে জানিয়েছেন, ‘রাজ্যসভায় আমরা কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন জমা দেব না।’ কারণ হিসেবে শুভেন্দু জানান, ‘ভোটের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত। বরং আমাদের লক্ষ্য এখন একজন হেরে যাওয়া মুখ্যমন্ত্রীকে আবারও হারানো।—জয় মা কালী।’
শুভেন্দুর এই ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবানীপুর কেন্দ্রে উপনির্বাচনে জোর দেওয়া নাকি রাজ্যসভায় শাসক দলের প্রার্থীকে হারানোর মতো ক্ষমতা না থাকার কারণেই বিজেপি পিছু হটল? বাংলা জয়ের পর তৃণমূল উত্তর-পূর্ব ভারতে মাটি তৈরি করতে বদ্ধপরিকর। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের আগে ত্রিপুরা—অসম একের পর এক রাজ্যে নিজেদের জমি তৈরির চেষ্টা করছে ঘাসফুল শিবির। কিছুদিন আগেই কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন প্রাক্তন সাংসদ সুস্মিতা দেব। সেই সুস্মিতাকেই এবার রাজ্যসভায় পাঠাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। গত ১৪ সেপ্টেম্বর তার নাম ঘোষণা করেছে দল। সোমবার বিধানসভায় সরকার পক্ষের মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষের ঘরে নথিপত্র সই করে নিজের মনোনয়ন জমা দেন সুস্মিতা। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর সুস্মিতা দেব বলেন, ‘একজন উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনীতিককে রাজ্যসভায় জায়গা করে দিয়েছেন মমতাদি। নতুন ইতিহাস হলো। আমি মনে করি এর জন্য গোটা উত্তর-পূর্বে একটা আলাদা ইমপ্যাক্ট পড়বে। আমার চেষ্টা থাকবে তৃণমূল কংগ্রেসকে ত্রিপুরা ও অন্যান্য রাজ্যে আরো শক্তিশালী করা। আজ থেকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেও আমার একটা নতুন সফর শুরু হলো। আশা করছি সবার জন্য ভালো হবে।’
অন্যদিকে ভবানীপুরে প্রথম দিকে বিজেপি মমতার বিপক্ষে প্রার্থী খুঁজতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। নিজেদের দলের কাউকেই ভবানীপুরে প্রার্থী হতে রাজি করাতে না পেরে নিজেদের অস্বস্তি ঢাকতে নির্বাচন কমিশনকে তীব্র সমালোচনা করে। বিজেপির সদ্য-সাবেক রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ প্রশ্ন তুলেছিলেন, লোকাল ট্রেন চলছে না। বাজার-হাট বন্ধ। লকডাউন আছে। রাতে কারফিউ আছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন কী করে মেনে নিচ্ছে যে, ভোটের উপযোগী পরিবেশ আছে?
বলাই বাহুল্য যে, ভবানীপুর বিধানসভা মমতার পুরোনো কেন্দ্র। সেখান থেকে মমতার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা খুব একটা সহজ কাজ যে নয়, বিজেপিও সেটা খুব ভালো করে জানত। তাই কাকে মমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামালে যুদ্ধ জেতা না গেলেও কিছুটা হলেও বেগ দেওয়ার চেষ্টা করে। শেষমেশ প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালের নামে সিলমোহর দেয় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। ভবানীপুর কেন্দ্রে প্রার্থী হিসেবে এই আইনজীবীর নাম নাকি শুভেন্দু অধিকারীও বলেছিলেন। এ বিষয়ে শাহ-নাড্ডার সঙ্গে আলোচনা করতে তিনি দিল্লি পৌঁছেছিলেন। তারপরই নাকি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সিলমোহর দিয়েছে।
ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ থেকে এখানে তৃণমূল প্রার্থী জিতেছে অন্তত ২৫ হাজারের বেশি ভোটে। প্রিয়াঙ্কা কি এবার তার ব্যতিক্রম ঘটাবেন? বরং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী হিসেবে ভবানীপুর বিধানসভাকেন্দ্রে একটা রেকর্ড তৈরি করবেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ। ২০১১ সালে বিধানসভা ভোটে জিতে প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময়ে তিনি ছিলেন সাংসদ। উপনির্বাচনে তিনি ভবানীপুর কেন্দ্রটিকেই বেছেছিলেন। প্রথমবার বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে তিনি সিপিএম প্রার্থী নন্দিনী মুখোপাধ্যায়কে ৫৪ হাজার ২১৩ ভোটে হারান। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটেও এই কেন্দ্রেই প্রার্থী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেবারও তিনি কংগ্রেস জোটের প্রার্থী দীপা দাশমুন্সিকে ২৫ হাজার ৩০১ ভোটে হারিয়েছিলেন। এবারও যে মমতা বড় ব্যবধানেই জিতবেন, সে কথা বিজেপিও জানে। তাই গতবারের মতো এবারও রাজ্যসভার নির্বাচনে প্রার্থী না দিতে পারার লজ্জা ঢাকতেই বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী হাওয়া গরম করার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। কারণ, রাজনীতিতে আনুগত্য চিরকালীন নয়। প্রত্যেকেই সব থেকে আগে নিজের ভালোটা বুঝে নিতে চায়। ফলে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে, কট্টর দিলীপপন্থি কাল অন্য কারো প্রিয়পাত্র হয়ে উঠবেন না। মোদি-শাহের ঘনিষ্ঠবৃত্তে থাকা বাবুল সুপ্রিয় তৃণমূলে যোগ দিয়ে বুঝিয়ে দেন যে, রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছুই হয় না। সবটাই সম্ভবনাময়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, বিজেপির সাংগঠিক যে নিয়মনীতি তাতে আর মাত্র কয়েক মাস পরে রাজ্য সভাপতির পদ থেকে দিলীপকে সরে যেতে হতোই। তাহলে কেন এত তাড়াহুড়ো করে রদবদল? আর ঘটনাটি ঘটানো হলো এমন একটা সময়, যার ২৪ ঘণ্টা আগে মোদি-শাহের ঘনিষ্ঠবৃত্তে থাকা বাংলার তরুণ নেতা বাবুল সুপ্রিয় জার্সি বদল করে ফেললেন। অবশ্য তিনি মন্ত্রিত্ব খোয়ানোর পর থেকেই গেরুয়া শিবির থেকে অনেকটাই দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। তাছাড়া তার তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করাটা ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি পদ থেকে দিলীপ ঘোষকে সময়ের আগে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে চর্চা চলছে দিলীপ ঘোষ অনুগামীদের মধ্যে। কেউ বলছেন, দিলুদা কিন্তু খড়গপুরের চাচা জ্ঞানসিং সাহেন পালের মতো কংগ্রেসের অপরাজেয় বিধায়ককে হারিয়েই বিধানসভার অলিন্দে প্রবেশ করেছিলেন। পরে মেদিনীপুর থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন সিপিআইয়ের পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত হওয়া মেদিনীপুরের সাংসদ আসনটি। আবার এসব মতামতের পালটা মতও উঠে আসছে দিলীপ ঘোষের বিরোধী শিবির থেকে। তাদের কেউ বলছেন, কবে ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছেন, সেটা স্মৃতি হতে পারে, বাস্তব নয়।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বালুরঘাটের বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদারকে রাজ্য সভাপতির পদে বসিয়ে বিজেপি একই সঙ্গে দুটি বার্তা সামনে আনলেন। প্রথমত, একুশের ভোটে দক্ষিণের তুলনায় উত্তর ভালো ফল করেছে। সেদিক থেকে উত্তরবঙ্গে দলকে আরো সুসংবদ্ধ করার বার্তা দেওয়া পাশাপাশি বয়সে তরুণ, শান্ত স্বভাবের সুকান্ত, যার সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর কোনো বিরোধ নেই। যে বিজেপির ভেতর ঐক্যবদ্ধ পরিবেশ রক্ষা করতে পারবে। তাই তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত বলে দলেরই একটি অংশের অভিমত।
এছাড়া সুকান্ত মজুমদারকে রাজ্য সভাপতি করে বিজেপি বুঝিয়ে দিল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরে বাড়তি নজর থাকবে গেরুয়া শিবিরের। এক অর্থে সুকান্তই প্রথম উত্তরবঙ্গ থেকে রাজ্য সভাপতি। তপন শিকদার আদতে মালদহের হলেও তার রাজনীতি ছিল কলকাতানির্ভর। পৃথক উত্তরবঙ্গ রাজ্যের প্রতিশ্রুতি বিধানসভা নির্বাচনের ইশতেহারে না থাকলেও কিন্তু ভোটের পরে পরেই সেই দাবি তুলে দেন দলের সাংসদ জনবালা। পরে তিনিই নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন। উত্তরবঙ্গকে বিজেপি আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে, তাই একা বালা নন, মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন কোচবিহারের সাংসদ নিশীথ প্রামাণিকও। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে কোচবিহারে পাঁচটি বিধানসভায় এগিয়ে ছিল বিজেপি। সেখানে এবার বিধানসভায় তারা জিতেছে ছয়টিতে। অতিরিক্ত জয়টি এসেছে সিআরপিএফের বুলেট-দীর্ণ শীতলখুচি আসনে। উত্তরবঙ্গকে বেশি গুরুত্ব দিতে আরো দুজনকে বিজেপি পুরস্কৃত করেছে। প্রথম জন দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তাকে সম্প্রতি বিজেপি যুব মোর্চার সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। তুফানগঞ্জের বিধায়ক মালতি রাভা রায়কে করা হয়েছে মহিলা মোর্চার সর্বভারতীয় সহসভাপতি। উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্রীয় বিজেপি বেশি গুরুত্ব দিতে ইংরেজবাজারের বিধায়ক শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরীকে মহিলা মোর্চার সর্বভারতীয় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এবার রাজ্য সভাপতিও করা হলো উত্তরবঙ্গ থেকেই। দিলীপ ঘোষকে তাই সরে যেতে হয়েছে। উত্তরকে ছেড়ে দিতে হয়েছে জায়গা।
n লেখক :ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক
