সঠিক সেবায় সুদিন ফিরুক

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:৩৩

বেশ কিছুদিন আগে কেজি দরে বিমান বিক্রির খবর আমাদের মধ্যে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অবাক করা ব্যাপার হলেও ঘটনাটি সত্য। স্থানসংকটে জায়গা খালি করতে দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পড়ে থাকা ১২টি বিমান নিলামে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। নিলামে কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পেলে বিমানগুলো ভাঙারি হিসেবে কেজি দরে বিক্রি করা হবে বলেও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পরিত্যক্ত ১২টি বিমানের মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের আটটি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের দুটি, জিএমজি এয়ারলাইনস ও এভিয়েনা এয়ারলাইনসের একটি করে বিমান রয়েছে। এই চারটি বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে পার্কিং চার্জ ও সারচার্জ বাবদ প্রায় ৪০০ কোটি টাকার মতো বকেয়া রয়েছে। বিমানগুলো দীর্ঘদিন ধরে কার্গোর জায়গা দখল করে থাকায় কার্গোর মাল ওঠানামায় জটিলতা তৈরি হয়, তাই বিমানবন্দর থেকে উড়জাহাজগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাই বাধ্য হয়ে উড়োজাহাজগুলো নিলামের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইনসের হাত ধরে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইনের যাত্রা শুরু হয়। এখন পর্যন্ত মোট ১২টি প্রাইভেট কোম্পানি এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করলেও টিকে আছে মাত্র দুটি। ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার—এ দুটি বেসরকারি বিমান সংস্থা বর্তমানে বাংলাদেশে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। করোনাকালীন বন্ধ করে দেওয়া রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ফ্লাইট চালু করার কথা থাকলেও চালু হয়নি এখনো।

বাংলাদেশ আয়তনে ছোট একটি দেশ। ছোট দেশ হওয়ায় খুব অল্প সময়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খুব কম সময়ে সহজে যাওয়া যায়। আকাশপথে ভ্রমণ দ্রুত ও আরামদায়ক হলেও ব্যয়বহুল, যার ফলে অভ্যন্তরীণ রুটে চলা বিমানগুলো যে যাত্রী পায়, তা দিয়ে ব্যয় পুষিয়ে লাভের মুখ দেখা বড়ই কষ্টসাধ্য। এছাড়া জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকাংশে। ২০১৮ সালের মন্দা কাটিয়ে না উঠতেই করোনা মহামারির হানা বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোকে আরো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। জনশক্তি রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি কর্মী দেশের বাইরে কর্মরত আছেন। যাদের অধিকাংশ সৌদি, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, বাহরাইন ইত্যাদি দেশে অবস্থান করছে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর জন্য এটি একটি বড় মার্কেট। তবে দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, বাংলাদেশের বিমানসেবা মানসম্মত নয়, যার কারণে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে টেক্কা দিয়ে তারা ব্যবসায় বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। এছাড়া মূলধনের অভাবে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো পুরাতন বিমান ক্রয় করে। ফলে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ পড়ে বেশি এবং অনেক সময় মারাত্মক দুর্ঘটনারও সম্মুখীন হতে হয়, যার কারণে দিনদিন দেশীয় বাজারের বড় একটি অংশ অন্যান্য দেশের বিমান সংস্থাগুলোর হাতে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মাত্র দুটি বেসরকারি বিমান সচল আছে, যার মধ্যে মাত্র একটি বিমান সংস্থা আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে। দেশে প্রতিদিন আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে লাখ লাখ যাত্রী আসা-যাওয়া করে। এই যাত্রীদের অধিকাংশই আসা-যাওয়া করে বিদেশি ফ্লাইটে, যার ফলে দেশের আয়ের বড় একটি অংশ বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তপোক্ত জায়গা করে নিতে পারত।

বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো বাঁচাতে সরকারকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। জেড ফুয়েলে ভর্তুকি, নতুন বিমান ক্রয়ে কর-সুবিধা প্রদান বেসরকারি বিমান সংস্থাকে এগিয়ে যেতে অনেকটা সাহায্য করবে। সরকারি সুবিধার পাশাপাশি বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর সেবার মান বাড়াতে হবে। ভ্রমণ আরামদায়ক, নিরাপদ ও সুন্দর করার লক্ষ্যে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে যাত্রীদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে বেসরকারি বিমান সেক্টরের সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া