ট্রাংকে নারীর লাশ :ছয় বছর পর ধরা পড়ল খুনি

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:৫১

২০১৫ সালের ৩ মে। সেদিন ভোরে চট্টগ্রামে এ কে খান মোড়ে ঈগল পরিবহনের কাউন্টারে টিকিট কেটে এক ব্যক্তি একটি ট্রাংক তুলে দেন বাসের বক্সে। ঐ ব্যক্তি বাসের হেলপারকে বলেন, সামনে ভাটিয়ারী কাউন্টার থেকে এক জন যাত্রী উঠবেন। এটি তার ট্রাংক। তিনি এটি বুঝে নেবেন। তবে ট্রাংকটি কেউ বুঝে নেয়নি। বিকালে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে ট্রাংক খুলে এক নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। এটি শনাক্তের কোনো উপায়ও ছিল না হেলপারের কাছে। আতঙ্কিত হেলপার তাত্ক্ষণিকভাবে খবর দেন দারুস সালাম থানায়। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। মরদেহের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। কেউ বাদী না হওয়ায়     দারুস সালাম থানা পুলিশের পক্ষে এসআই জাহানুর আলী বাদী হয়ে আসামি ‘অজ্ঞাত’ উল্লেখ করে একটি মামলা করেন। কয়েক দফা হাতবদলের পর তদন্তের দায়িত্ব আসে পিবিআইয়ের হাতে। অবশেষে ঐ নারীর হত্যাকারীকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করে সংস্থাটি। পরে রেজাউল করিম স্বপন নামে ঐ ঘাতককে  গ্রেফতার করা হয়।

মামলার রহস্য উদ্ঘাটন নিয়ে গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে পিবিআই। সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির প্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানান, শুরুতে থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে। এরপর সিআইডি দীর্ঘ চার বছর তদন্ত করে। কিন্তু মরদেহের পরিচয় শনাক্ত এবং হত্যারহস্য উন্মোচিত না হওয়ায় আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করা হয়। দাখিল করা চূড়ান্ত রিপোর্ট না নিয়ে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে দেয়।

তিনি বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা সশরীরে চট্টগ্রামে গিয়ে ২০১৫ সালে এন্ট্রিকৃত ১০-১২টি ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ঘটনার জিডি সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে একটি ছিল শম্পা বেগমের। শম্পার মরদেহ উদ্ধারের কয়েক দিন আগে তিনি চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানা এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন।

পিবিআইয়ের তদন্ত দল শম্পা বেগমের বাবা ইলিয়াস শেখের (অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য) সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারে, ২০১৩ সালে রেজাউল করিম স্বপন (অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনী সদস্য) খুলনার তিতুমীর নৌঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন। আর শম্পা স্থানীয় একটি হাসপাতালে মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করতেন। সেই হাসপাতালে শম্পা বেগমের সঙ্গে আসামি রেজাউলের পরিচয় হয়। এরপর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিছুদিন পরই রেজাউল বদলি হয়ে চট্টগ্রামে চলে যান। শম্পাও কিছুদিন পর চট্টগ্রামে চলে যান।

চট্টগ্রামে শম্পা তার ফুপুর বাসায় কিছুদিন থাকেন। এরপর তিনি রেজাউলকে নিয়ে ফয়’স লেক এলাকায় একটি হোটেলে কিছুদিন অবস্থান করেন। পরবর্তী সময়ে পাহাড়তলী এলাকার উত্তর গ্রিনভিউ আবাসিক এলাকায় একটি বাসায় সাবলেট নিয়ে থাকতে শুরু করেন। স্থানীয়দের কাছে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে থাকলেও তারা প্রকৃতপক্ষে বিয়ে করেননি।

পিবিআই প্রধান বলেন, এক সঙ্গে থাকাকালীন দুজনের মধ্যে নানা বিষয়ে মনোমালিন্য দেখা দেয়। এক পর্যায়ে ২০১৫ সালের ২ মে গভীর রাতে শম্পাকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন রেজাউল। এরপর তিনি শম্পার মরদেহ গোপন করার জন্য একটি ট্রাংকে করে বাসে তুলে দেন। পাশাপাশি শম্পার বাবাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘শম্পাকে খুলনার বাসে তুলে দেওয়া হয়েছে।’  কিন্তু শম্পা তার বাবার বাড়িতে না পৌঁছলে তার ভগ্নীপতি আব্দুল মান্নান পাহাড়তলী থানায় জিডি করেন। দীর্ঘ তদন্তের পর শুক্রবার রাতে পিবিআইয়ের একটি দল রেজাউল করিম স্বপনকে কুমিল্লা জেলার ইপিজেড এলাকার বাসা থেকে  গ্রেফতার করে। গতকাল শনিবার রেজাউলকে আদালতে পাঠানো হয়। তিনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। রেজাউলকে তার বাহিনী থেকে ২০১৯ সালে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।