শিফারুল শেখ
এক সময় তাকে বর্ণনা করা হতো ‘জার্মানির রানি’ হিসাবে। কেউ বলতেন ‘ইউরোপের সম্রাজ্ঞী’। জার্মানদের কাছে ‘মা’ হিসাবে খ্যাতি পাওয়া অ্যাঙ্গেলা মার্কেল দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন ১৬ বছর। ১৯৫৪ সালের ১৭ জুলাই জন্ম নেওয়া মার্কেল ২০০৫ সাল থেকে জার্মানির চ্যান্সেলর। ২০০০ সাল থেকে জার্মানির অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী ইউনিয়নের (সিডিইউ) প্রধান। সেই তিনি বিদায় নিচ্ছেন।
গতকাল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার উত্তরসূরি কে হবেন এবং তিনি মার্কেলের মতো কেবল জার্মানিকে নয়, ইউরোপকেও কীভাবে সামলাবেন তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই দুশ্চিন্তা। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে জার্মানির গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রতিযোগিতাও আছে। মার্কেলের বিদায়ের পর ইইউতে তার স্থান দখল করতে চান ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ। তাই জার্মানির ভবিষ্যত্ নেতৃত্ব ইইউতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন না করলে আগের মর্যাদা হারাতে হবে।
g একজন অ্যাঙ্গেলা মার্কেল
জার্মানির নির্বাচন নিয়ে যতটা আলোচনা তার চেয়েও বিশ্ব মিডিয়ায় বেশি আলোচনা হচ্ছে মার্কেলকে নিয়ে। তিনি ইইউর বর্তমান নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে নেতৃত্বে। তিনি প্রায় ১০০টি ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। ইইউকে বহু সংকট
পার হতে সহায়তা করেছেন।
অভিবাসন সংকট, ইউরো সংকট, কোভিড-১৯ এমনকি কিছুটা ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রেও। কিন্তু মার্কেলের রাজনৈতিক জীবন দুই ভাগে বিভক্ত। ইউরোপের নেতা হিসেবে এবং জার্মানির নেতা হিসেবে তার উত্তরাধিকার আসলে ভালো-মন্দ মিলিয়ে। মার্কেলের সমালোচনা হয় এজন্য যে গত ১৬ বছরের শাসনকালে তিনি ছিলেন একজন ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’। সংকট সামাল দিতে তিনি অপেক্ষা করতে করতে একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন।
বলা হয়, তিনি একজন বাস্তববাদী, কিন্তু দ্রষ্টা নন। সমালোচকরা বলেন, ইউরোপের নেত্রী হিসেবেও তিনি একইভাবে কাজ করেছেন। বলা হয়, মার্কেল যা করেছেন তার অভিঘাত, রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার পরও বহু দিন অনুভূত হবে। মার্কেলের বাস্তববুদ্ধি অনেক সময় ইইউকে বহু সংকট পার হয়ে আসতে সহায়তা করেছে যা কখনো কখনো ইইউর অস্তিত্বতে বিপন্ন করতে পারত। ধরা যাক, ২০১৫ সালের ইউরোজোনের সংকটের কথা। গ্রিসের খ্যাপা অর্থমন্ত্রী ইয়ানিম ভারুফাকিসও স্বীকার করেন, তার দেশের আর্থিক দুরবস্থা সত্ত্বেও গ্রিসকে ইউরোজোনের ভেতরে রেখে মার্কেল আসলে ইউরো মুদ্রাকে বাঁচিয়েছেন। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত মার্কেলের জন্যই ইউরোজোন টিকে গেছে। কারণ গ্রিস বেরিয়ে গেলে ইউরোজোনকে একসঙ্গে রাখা সম্ভব হতো না।
g কেমন হবে জার্মানির ভবিষ্যত্?
সরকার গঠনে জার্মানিতে সাধারণত একাধিক দল মিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট হয়। এরপর তারা নিজেদের মধ্য থেকে চ্যান্সেলর নির্বাচন করে। কে হবেন নতুন চ্যান্সেলর সেটি নির্ভর করবে পরবর্তী জোটের ধরনের ওপরে। মার্কেল সরকারের জোটে ছিল সিডিইউ/সিএসইউ ও এসপিডি। গ্রিন পার্টি বা সবুজ দল পালন করেছে বিরোধী দলের ভূমিকা।
এবারের নির্বাচনের ফলাফল ও তারপর সম্ভাব্য জোট সরকার গড়ার উদ্যোগ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা বাড়ছে। এসপিডি প্রার্থী ওলাফ শলত্স ও ইউনিয়ন শিবিরের প্রার্থী আরমিন লাশেটের হাতে পার্লামেন্টের আসনসংখ্যার মধ্যে ফারাক খুব কম হলে দুই পক্ষই সমান্তরালভাবে সরকার গড়তে বাকিদের সঙ্গে আলোচনা চালাতে পারে। ১৯৭৬ সালে এমন পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় শক্তিশালী শিবির হিসেবে এসপিডি দলের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছিল। জনমত সমীক্ষার পূর্বাভাস সত্য প্রমাণিত হলে দুইয়ের বদলে তিনটি দলের জোট অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। ১৯৪৯ সালে ফেডারেল জার্মান প্রজাতন্ত্র গঠনের পর তিন বছর এমন সরকার ক্ষমতায় ছিল। তারপর থেকে কখনো এমন তিন দলের সরকার গঠনের প্রয়োজন হয়নি। মার্কেলের উত্তরসূরিদের নীতিই জার্মানির ভবিষ্যত্। এই নীতির ধারক চ্যান্সেলর হলেই বোঝা যাবে কেমন হবে জার্মানি ও ইইউর ভবিষ্যত্। প্রার্থীদের নীতি নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে জার্মান মিডিয়া ডয়চেভেলে।
g শরণার্থী নীতি
২০১৫ সালে হাঙ্গেরিতে আটকে থাকা শরণার্থীদের জন্য জার্মানিতে প্রবশের দুয়ার খুলে দেওয়ার যে নীতি মার্কেল নিয়েছিলেন তা বিশ্ব জুড়ে আলোচিত হয়। পার্লামেন্টে মার্কেলের দলের ভোট রেকর্ড থেকে দেখা যায়, তাদের এক-চতুর্থাংশ আরো উদার অভিবাসন নীতিতে বিশ্বাসী। তবে তার জোট ২০১১ সালে সিরীয় শরণার্থীদের বের করে দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধের একটি প্রস্তাবে বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল। এই প্রস্তাবটি তুলেছিল সবুজ দল। বায়েরবোক ও তার দল বরাবরই উদার শরণার্থী নীতির পক্ষে ভোট দিয়েছে। ২০২০ সালে গ্রিসে শরণার্থী ক্যাম্পে আগুন লাগার পরিপ্রেক্ষিতে জার্মানির আরো শরণার্থী গ্রহণের পক্ষে কথা বলেছেন এসপিডির রাজনীতিকরা। সেই সঙ্গে ২০১৫ ও ২০১৬ সালের শরণার্থী স্রোতের সময় দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেন তারা। অন্যদিকে এই বিষয়ে মার্কেলের দল সিডিইউর বর্তমান চেয়ারম্যান আরমিন লাশেট বরাবরই মার্কেলকে সমর্থন দিয়ে এসেছেন।
g বিদেশে সামরিক মিশন
জার্মানির সৈন্যরা বর্তমানে সারা বিশ্বে ১২টি মিশনে নিযুক্ত। বিরোধী দল হিসেবে গ্রিন পার্টি এর কয়েকটিতে মাত্র সমর্থন দিয়েছিল। এছাড়া উদাহরণ হিসেবে বায়েরবোক বরাবরই ভূমধ্যসাগরের নিরাপত্তায় ন্যাটোর ‘সি গার্ডিয়ান অপারেশন’এ জার্মানির সামরিক অংশগ্রহণের বিরোধী ছিলেন। একইভাবে ইরাক ও সিরিয়া মিশনেরও সমর্থন দেননি তিনি। তবে উত্তর আফ্রিকা ও লেবানন মিশনের পক্ষে অবস্থান নেন তারা।
g জলবায়ু নীতি
গ্রিন পার্টির প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু জলবায়ু। বুন্ডেসটাগে এ সংক্রান্ত অনেক প্রস্তাব হাজির করেছে তারা। ২০২২ সালের মধ্যে কয়লার ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা এর একটি। পাশাপাশি সরকারের জলবায়ু নীতি বিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগেও দলটি সমর্থন দিয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে উদ্যোগগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে, সেখানে বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে সবুজ দলের অর্ধেকের বেশি জলবায়ু প্রস্তাব মার্কেল ও তার জোট সমর্থন করেছে।
জলবায়ু সুরক্ষা কর্মসূচি-২০৩০-এ বিমান শিল্পের ওপর কর বৃদ্ধি করা তারই উদাহরণ। বিপরীতে মার্কেল ও তার দল সৌরবিদ্যুতে ভর্তুকির বিপক্ষেও ভোট দিয়েছে। পার্লামেন্টে ভোটের রেকর্ড থেকে জলবায়ু নীতি নিয়ে লাশেট বা শলত্স এর অবস্থান সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। তবে জলবায়ু ইস্যুতে অল্প কয়েকটি ভোটের মধ্যে লাশেট প্রাণিকল্যাণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ নীতির বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছেন। জনসম্মুখে জলবায়ু নীতি নিয়ে তাকে বেশ দ্বিধাগ্রস্ত মনে হয়। তিনি বরাবরই শিল্প ও অর্থনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
g ইইউ নিয়ে অবস্থান
পার্লামেন্টে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিষয়ক বিভিন্ন প্রস্তাব সাধারণত সরকার দলীয় জোটই উপস্থাপন করে আর সেগুলো সহজেই পাশ হয়। এক্ষেত্রে গ্রিন পার্টি নিজেরা উদ্যোগী না হলেও বিভিন্ন সময়ে সিডিইউ/সিএসইউ-এর প্রস্তাবগুলোকে সমর্থন দিয়েছে। বিরোধী দলে থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে গ্রিন পার্টি এই ইস্যুতে সরকারি জোটকে সমর্থন জুগিয়েছে।
তথ্যসূত্র :বিবিসি ও ডয়চেভেলে
