তৌহিদ আজিজ
আফগানিস্তানে গত মাসে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অনেকেই বলছেন, এই বিভাজন বা অন্তর্দ্বন্দ্ব অনেক গভীর চলে গেছে। এতে করে প্রশ্ন উঠছে তাহলে যে ঐক্যের দাবি করছেন তারা তাতে কি ফাটল ধরেছে? বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা কোনো বিশ্লেষণ না থাকলেও সাম্প্রতিককালের অনেক ঘটনা তারই ইঙ্গিত বহন করছে।
চলতি মাসের প্রথম দিকের ঘটনাপ্রবাহ অনেকের মধ্যেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে উপপ্রধানমন্ত্রী মোল্লাহ আবদল ঘানি বারাদার হঠাত্ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া তেমন প্রশ্নেরই উদ্রেক করে। প্রথমে খবর আসে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের অভ্যন্তরে কোন্দল চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মারা গেছেন। পরে বারাদারের একটি অডিও বার্তা প্রকাশ করে তালেবান। তাতে বারাদার জানিয়েছেন, কাবুল থেকে কান্দাহারে চলে যাওয়ার কারণেই তাকে জনসম্মুখে দেখা যায়নি। তিনি বলেছিলেন, তালেবানের প্রতি তার যে সহানুভূতি, তা কোনো অংশেই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের চেয়ে কম নয়। বারাদারের এই অডিও বার্তার সত্যতা নিয়েও তখন কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সব সন্দেহকে উড়িয়ে দিয়ে তার ছবি প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন। বিষয়টি নিয়ে আলজাজিরার প্রতিবেদনেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, তালেবানের নেতৃত্বে যে বিরোধ তা বাস্তবিক অর্থে সত্য। ভবিষ্যতে যদি এ ধরনের ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে এর নেতিবাচক ফল ভোগ করবে সাধারণ মানুষ। কারণ যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে তালেবান দীর্ঘ ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এখন যদি ‘গৃহদাহ’ শুরু হয়, তাহলে সে আগুনে পুড়বে সবাই।
সূত্র বলছে, তালেবানের মধ্যে বিভক্তির মূল কারণ রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজন। এর কট্টোরপন্থি সদস্যরা মনে করেন, ২০ বছর লড়াইয়ের অর্জন আজকের তাদের ক্ষমতায় ফেরা। কিন্তু দিনশেষে হিসাবের খতিয়ানে বেরিয়ে আসছে হতাশার চিত্র। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা নেতাদের মধ্য থেকে শুরু করে রাজপথে থাকা সদস্যদের মধ্যেও এই বিরোধ ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে দলটির মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ক্রমেই জেগে উঠছে। আবার গোষ্ঠীটির প্রতি মানুষের আস্থাও কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কেন না তালেবান একেকটি এলাকা দখলের পর তাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে। সেইসঙ্গে কেড়ে নিচ্ছে মূল্যবান জিনিসপত্র। সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা তাদের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। এমনকি যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল তাও তারা নিয়ে নেয়। তালেবানের তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপমন্ত্রী জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ প্রথমদিকে এসবের বিরুদ্ধে কথা বললেও পরে অনেক ঘটনার ভিড়ে এগুলো চাপা পড়ে যায়। অবশ্য মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে তাদের ফারাক রয়েছে।
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু নিয়েও দ্বন্দ্ব রয়েছে তাদের মধ্যে। তালেবান সরকারের মূল ক্ষমতা রাখা হয়েছে কান্দাহারের শুরা কাউন্সিলের হাতে। গোষ্ঠীটির বর্তমান নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কেন্দ্রীক এই শুরা কাউন্সিলই আফগানিস্তানের প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ বলে মনে করে একটি অংশ। এর ফলে নতুন প্রশাসনে নিজেদের অবস্থান নিয়ে বেশ কয়েক জন তালেবান নেতা বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছেন। তবে দলটির মধ্যে আগের প্রশাসনের চেয়েও উচ্চভিলাষী ব্যক্তি রয়েছেন। তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের ছেলে বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা মুহাম্মদ ইয়াকুব কট্টোরপন্থিদের একাংশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বিপরীত দিক থেকে উপপ্রধানমন্ত্রী বারাদার ও উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী শের মুহাম্মদ আব্বাস স্টানিকজাই অনেক বেশি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন অংশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই অংশটি আফগানিস্তানকে অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইছেন।
বর্তমানে দেশটি তাদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য মরিয়া। কিন্তু অনেক দেশই সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে, তালেবান সরকারকে তারা স্বীকৃতি দিবেন না। এ অবস্থায় গোষ্ঠীটির মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক চাপও বাড়ছে। এতে করে সামনে তাদের জন্য কঠিন দিন অপেক্ষা করছে। এছাড়া অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত দেশটিতে এখন চরম তারল্য সংকট বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও প্রায় সাড়ে ৯০০ কোটির ডলারের তহবিল জব্ধ করে রেখেছে। এ অবস্থায় তালেবান ক্ষমতায় থাকলেও বিশাল অঙ্কের তহবিল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই সামনের দিনগুলোতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মিটিয়ে তালেবান কতটা সফলতার সঙ্গে দেশ চালাতে পারবে তার দিকেই তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব।
