n শিমুল খালেদ
টিলা থেকে নিচে নামার সময় দেখতে পেলাম অপরূপ সেই দৃশ্য। কমলালেবুর মতো ছোট ছোট পাতা আর সরু কাণ্ডের আগর গাছের বন, তার নিচের অংশে যেন জমাট বেঁধে আছে মেঘদল। দেখতে মেঘের মতোই এই জমাট বাধা ঘন কুয়াশা। এখানে যেন থমকে আছে বিশ্বচরাচর! প্রকৃতির নীরবতায় যেন সম্মতি জানিয়েছে গাছের পাতারাও। নড়ছে না কেউ কোথাও।
আসলে সাতসকালে আমরা বেরিয়েছি হাকালুকি হাওড়ের উদ্দেশে। দেশের বৃহত্তম হাওড় হাকালুকি। যা বড়লেখা, জুড়ি, কুলাউড়া, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা ছাড়াও সিলেট ও মৌলভীবাজারের আরও কয়েকটি উপজেলাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। তাই একাধিক পথে হাকালুকিতে যাওয়া যায়। আমাদের প্ল্যান ছিল, এবার প্রচলিত পথের বদলে নতুন কোনো পথে হেঁটে হাকালুকিতে বেড়াতে যাওয়া। সেই উদ্দেশ্য নিয়ে বন্ধু সৌরভের বাড়ি রতুলীতে গিয়ে ডেরা বেঁধেছিলাম আগের দিনই। খুব ভোরেই মারুফ এসে পৌঁছার পর কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে তিনজন বেরিয়ে পড়লাম। রতুলীর পরই পড়ল কামিলপুর। এই গ্রামেও সুগন্ধি বৃক্ষ আগরের দেখা মিলল পথে পথে। পাকা রাস্তা শেষ হয়ে এলে একটি ছড়ার পাশ দিয়ে এগিয়ে চললাম। এই শীতের মৌসুমেও ছড়াটি কানায় কানায় পূর্ণ। পানিও একদম টলটলে পরিষ্কার। সৌরভ জানাল ছড়াটির নাম মাধবগাঙ্গ। নাম শুনেই আন্দাজ করেছিলাম এর উত্স সম্পর্কে। মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত থেকেই আসছে এ পানির প্রবাহ। মাধবগাঙ্গের পাড়জুড়ে কলমিবনের আধিপত্য। ছড়ার পাশের উর্বর জমিতে রবি শস্যের আবাদ দেখতে পেলাম। সর্ষে আর সয়াবিনের ফুল যেন হলুদ কার্পেটে মুড়িয়ে রেখেছে মাঠ। কলমিপাতা আর সর্ষে ফুলের পাঁপড়ি বেয়ে ঝরে পড়া মুক্তার দানার মতো শিশির বিন্দুতে মন জুড়িয়ে যায়। ফসলের মাঠ শেষ হয়েছে একটি টিলার পাদদেশে গিয়ে। টিলাটি ঘন বাঁশঝাড়ে ঢাকা। বাঁশবন আর ঝোপঝাড়ের ফাঁকে হাঁটার পথ খুঁজে নিলাম। টিলা থেকে বের হয়ে মাধবগাঙ্গের পাড়ে আবার নিজেদের আবিষ্কার করলাম। সামনেই পড়ল ধনুকের মতো বাঁকা একটি সেতু। সেতুটি পার হয়ে এসে পথের বাঁক পেরোতেই রাস্তা লাগোয়া একটি ঝোপ নড়েচড়ে উঠল। সচকিত হয়ে তাকাতেই সেখান থেকে বেরিয়ে এলো চার-পাঁচটি তিতির পাখি। তিতির গৃহপালিত পাখি হলেও সেটি এখন বেশ বিরল। তারা যেন অনাহুত আগন্তুকদের এ সময় আশা করেনি। তাই বিচিত্র শব্দে ডাকতে ডাকতে পালিয়ে যায়। তারপর শতবর্ষী একটি মসজিদের সামনে এসে পড়লাম। মসজিদটির নামফলক থেকে জানলাম, নির্মাণকাল ১৯০৪ সাল। এরপর হাঁটতে হাঁটতে আজিমগঞ্জ বাজার পিছনে ফেলে আমরা সালদীঘায় গিয়ে থামি। হাকালুকি পাড়ের শেষ গ্রাম এটাই। গ্রামটির মাঝ বরাবর চলে গেছে জুড়ি উপজেলা পর্যন্ত পাকা রাস্তা। দাসের বাজার থেকে শুরু হয়ে এই রাস্তাটির প্রায় পুরোটাই চলে গেছে হাওড়ের পাশ দিয়ে। বর্ষায় হাকালুকির উত্তাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে এর গায়ে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ রোডের আদলে এটিকে হাওড় ড্রাইভ রোড বললে অবশ্য মন্দ হতো না। সালদীঘা থেকে হাওড়ের দিকে চলে যাওয়া মেঠোপথ ধরে হাঁটার সময় রাস্তার একপাশে ঘন মুর্তার বন দেখতে পেলাম। এসব মুর্তা দিয়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য শীতলপাটি বানানো হয়। মুর্তা বনের ফাঁকে ফাঁকে মাথা উঁচিয়ে আছে হিজল গাছ। হিজলের ডালে ডালে কানের দুলের মতো ঝুলে আছে হিজল বীজের লতা। ছবি তোলার ফাঁকে বাকি দুজন থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলাম। সৌরভের ডাক শুনে জোর পায়ে সামনে গেলাম। সে ঝোপের ফাঁক দিয়ে আঙুল তাক করে একটি হিজল গাছ দেখাল। তাকিয়ে দেখলাম গাছটিতে একটি খোড়ল। তার ভিতর কিছুটা ঘাস-পাতা। এ ধরনের খোড়লের ভিতর পেঁচা বাসা বানিয়ে থাকে। হাওড়পারের মানুষজন মেঠোপথের ধুলা উড়িয়ে বেরিয়ে পড়তে শুরু করেছে। হাকালুকির শিশির ভেজা সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে আমরা বেশ বড়সড় একটি জলার সামনে গিয়ে থামলাম। পুরো জলাটি লাল শাপলায় ভরপুর। রক্তিম আভায় ফুটে থাকা ফুলগুলো যেন একেকটি ঝলঝলে তারা। সূর্যের আলো কুয়াশার চাদর ভেদ করে তখনো না উঠতে পারলেও শাপলার আলোয় যেন ভরে আছে পুরো জলাটি। জলার পানিতে কয়েকটি পানকৌড়ি বিরামহীন ডুব দেওয়া আর ভুস করে মাথা তোলার খেলায় মেতেছিল। কিছু আবার আহারপর্ব সেরে বাঁশের কঞ্চিতে বসে পাখা ছড়িয়ে গা গরম করছিল। জলার পরিষ্কার পানিতে কিছু ডিঙি নাও ডুবিয়ে রাখা। হাওড়ে পানি বাড়লে এই নৌকাগুলোই হয়ে যাবে মানুষের চলাচলের একমাত্র উপায়। আমাদের বিমূঢ়তায় ছেদ ঘটিয়ে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল একঝাঁক পরিযায়ী পাখি। পাখির দলটি যাচ্ছে হাওড়ের আরও গভীরে। জলা পেরিয়ে আমরা হাওড়ের মাঝে কিছুটা উঁচু একটা জায়গায় এসে দাঁড়ালাম। বড় একটি পাকুড় গাছের নিচে দেখতে পেলাম শ্যাওলা ধরা পুরোনো পাকা দেয়াল। চারকোনা দেয়ালটির ভিতরেও বটপাকুড়ের চারা জন্মেছে। কাছেই পড়েছিল কিছু পরিত্যক্ত কাঠের টুকরো। কৌতূহল মেটানোর জন্য কাউকে খুঁজছিলাম। কিছুটা দূরে বোরো ধানের চারা বুনছিলেন একজন চাষি। তার কাছ থেকে জানলাম, এটা শ্মশানঘাট। আমরা হাওড়ের মাঝে জলার ধারে ধানক্ষেতের আল দিয়ে হাঁটতে থাকি। কিছুটা দূরেই ছিল নলখাগড়ার একটি ঝোপ। ঝোপটির কাছে যেতেই বাতাস কাঁপিয়ে উড়ে গেল একঝাঁক সরালি হাঁস। চোখের ঘোর কাটিয়ে দেখি ডানার জল ফেলে তাদের উড়ে যাওয়া। এরপর আরেকটু সামনে গিয়ে দেখা পেলাম লম্বা লম্বা পায়ের অনেকগুলো সাদা বক। কোনোটা মেপে মেপে পা ফেলে কাদার ভিতর ঠোঁট ডুবিয়ে শিকার খুঁজছে। কোনোটা আবার একপায়ে দাঁড়িয়ে পালকগুলো ফুলিয়ে যেন ধ্যানে মগ্ন। মাথার ওপর দিয়ে তীক্ষ স্বরে একটি মেছো ঈগল হাওড়ের জলায় ছোঁ মেরে উড়ে গিয়ে দূরে একটি গাছের উঁচু ডালে বসল। কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্য ওঠার পর রোদ গায়ে চড়তে থাকলে আমরা পাকুড় গাছটির ছায়ায় ফিরে গেলাম।
কিভাবে যাবেন :বড়লেখা হয়ে হাকালুকি হাওড়ে যেতে চাইলে ধরতে হবে ঢাকা-বিয়ানিবাজার রুটের বাস। ভাড়া পড়বে পাঁচশ টাকা। বাস নামিয়ে দেবে বড়লেখায়। এছাড়া সিলেটের ট্রেনে কুলাউড়ায় নেমে লোকাল পরিবহনেও বড়লেখায় যাওয়া যাবে। মানসম্পন্ন হোটেল পাবেন বড়লেখা বাজারে। বড়লেখা বাজার থেকে হাওড় পর্যন্ত রিজার্ভে সিএনজি পাওয়া যায়। তবে ভোরের হাওড় দেখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো হাওড়ের ধারেকাছে কোথাও ক্যাম্পিং করে থাকা।
