দুদকের চিঠির ভিত্তিতে ব্যক্তির বিদেশ গমন ঠেকানো যাবে না—হাইকোর্টের এমন রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল পর্যবেক্ষণসহকারে নিষ্পত্তি করে দেওয়া হয়েছে। দুদকের আপিল নিষ্পত্তি করে দিয়ে আপিল বিভাগ বলেছে, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ পাবে ১৫ দিনের মধ্যে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ গতকাল সোমবার এই আদেশ দেয়। এই রায় প্রকাশের পরই জানা যাবে দুর্নীতি বা অন্যান্য ফৌজদারি মামলার আসামির বিদেশ গমন ঠেকাতে দুদক বা অন্য সরকারি সংস্থাগুলোকে কতটুকু কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা কাউকে ব্লাংক চেক দেব না।
ব্যক্তির বিদেশ গমন ঠেকাতে দুদকের চিঠির বৈধতা নিয়ে পাঁচটি রিট আবেদনের ওপর রায় ও আদেশ দেয় হাইকোর্ট। এর মধ্যে আতাউর রহমান খানের করা রিটের রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, দুর্নীতি বা অন্য মামলার অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বা চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে দেশে কোনো আইন ও বিধি নাই। তবে সময়ের প্রয়োজনে এ ধরনের আইন ও বিধি প্রণয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু আইন ও বিধির অনুপস্থিতিতে সরকার কিংবা রাষ্ট্রের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা শুধু ‘শৌখিন’ বা ‘খেয়ালের’ বশবর্তী হয়ে দেশের কোনো নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করতে বা নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে না। আদালত বলেছে, এক জন নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা ব্যক্তি জীবনের স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত, যা শাশ্বত। এ স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে হলে আইন নির্ধারিত নিয়মে বা পদ্ধতিতে করতে হবে। রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় আমাদের সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট অভিমত এই যে, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত হবে—অনুসন্ধান বা তদন্ত পর্যায়ে যে কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তির দেশত্যাগ ঠেকাতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন করা। যতক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের আইন ও বিধি প্রণীত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে এক্তিয়ার সম্পন্ন আদালতের নিকট দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে অনুমতি গ্রহণ করতে হবে।
এই রায়সহ মোট পাঁচটি রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করে দুদক। ঐ লিভ টু আপিল গতকাল সোমবার নিষ্পত্তি করে দিয়েছে আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি ছাড়াও বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন, বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
আদেশের পর প্রধান বিচারপতি উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের রায় বা আদেশ সংক্ষিপ্ত হবে। অপেক্ষা করুন দুই সপ্তাহের মধ্যে সত্যায়িত অনুলিপি পেয়ে যাবেন। তখন সেখানেই উল্লেখ থাকবে আমাদের নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণগুলো।
প্রসঙ্গত আতাউর রহমান জন্মসূত্রে একজন বাংলাদেশের নাগরিক। পরবর্তী সময়ে সুইডেনে নাগরিকত্ব লাভ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ও সুইডেনে তার ব্যবসা চলমান এবং তার পরিবার সুইডেনে অবস্থান করছে। গত বছরের ২৪ আগস্ট দুদক তাকে সম্পত্তির হিসাব দাখিল করতে নোটিশ দেয়। ২২ অক্টোবর সম্পত্তির হিসাব দাখিল করেন তিনি। ঐ বছরের ২১ ডিসেম্বর পত্রিকার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে দুদকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পরে এ সংক্রান্ত চিঠির কপি সংগ্রহ করে হাইকোর্টে রিট করেন। ঐ রিটের দীর্ঘ শুনানি নিয়ে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার চিঠি অবৈধ ঘোষণা করে এ রায় দেয় হাইকোর্ট। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, দুদকের পক্ষে মো. খুরশীদ আলম খান, রিটকারী পক্ষে প্রবীর নিয়োগী, মুরাদ রেজা, মাহবুব উদ্দিন খোকন ও মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল শুনানি করেন।
