জেলেপাড়া থেকে মাইক্রোসফটে পৌঁছার গল্প

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:১২

>> তানভীর তানিম

 

শৈশব থেকেই অভাব ছিল নিত্যসঙ্গীর। মাত্র তিন বছর বয়সে হারান বাবাকে। এরপর মায়ের সঙ্গে আসেন মামাবাড়ি। সেটিও চাকচিক্যময় কোনো প্রাসাদ নয়, চট্টগ্রামের পতেঙ্গার জীর্ণশীর্ণ এক জেলেপাড়া। এই জেলেপাড়া থেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু নিখিল দাশের। বিদেশে পড়ালেখা করার আগ্রহ সেই ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু অভাবের সংসারে এ স্বপ্ন যেন গরিবের ঘোড়ারোগ। জীবনে চলার পথে থমকে দাঁড়াতে হয়েছে বারবার; দারিদ্র্যের চোখরাঙানি সহ্য করতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু  কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। নিজের ইস্পাতকঠিন মনোবল, দৃঢ় সংকল্প আর অক্লান্ত পরিশ্রমকে পুঁজি করে নিখিল ঠিকই ছুঁয়েছেন তার স্বপ্নকে। সর্বশেষ গত ১৮ এপ্রিল ল্যাব ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিনি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটে ক্যারিয়ার শুরু করেন।

নিখিলের জন্ম বাবার বাড়ি কালুরঘাটের মোহরাতে। নিরাঞ্জন কুমার জলদাশ ও কমলা দাশ দম্পতির একমাত্র সন্তান তিনি। অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর পর এখন মা-ই তার একমাত্র ছায়া। পড়ালেখার হাতেখড়ি স্থানীয় ওয়াইডব্লিউসিএ (YWCA) স্কুলে। ২০০৫ সালে তিনি ইস্টার্ন রিফাইনারী হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপরই বিদেশে পড়ালেখা করার সেই পুরনো ভূত চেপে বসে নিখিলের মাথায়। চেষ্টা করতে থাকেন, কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় তখন সেটি সফল হয়নি। উল্টো নিজের লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকতে গিয়ে শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে ফেলেন দুটি বছর। ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। সেখান থেকে স্নাতক ও ্লস্নাতকোত্তর শেষ করে বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজে গণিতের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। চালিয়ে যেতে থাকেন উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রচেষ্টা।

গবেষণার প্রতি তীব্র টান, জীবনের রূঢ় বাস্তবতা কিংবা হাড়ভাঙা পরিশ্রম এই সবকিছুর সাক্ষী হয়ে আছে নিখিলের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। কলেজ থেকে টিউশনি করে চলা নিখিল—এ সময়ে দিনরাত টিউশনি করিয়েছেন, খরচ জোগাতে চালিয়েছেন চায়ের দোকান।  অবশেষে ২০১৭ সালে ফিনল্যান্ডের ত্যামপেরে ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি স্কলারশিপ পান। সেই সময়কার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আক্ষেপ ঝরে পড়ল তার। নিখিল বলেন, ‘স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি কলেজপড়ুয়া কাউকে যখন টিউশনি করাতাম। তখন প্রায়ই মানুষের অবজ্ঞা-অবহেলার সম্মুখীন হতাম। স্কুল শাখার শিক্ষক হয়ে কলেজের শিক্ষার্থীদেরকে কিভাবে পড়াই—এটা নিয়ে অনেকে হেয় প্রতিপন্ন করত। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হিসেবে এসব যে আমার নখদর্পণে, এটা তারা বুঝতে চায়নি। স্কলারশিপ নিশ্চিত হওয়ার পর ২০১৮ সালে নিখিল পাড়ি জমান ফিনল্যান্ডের ত্যামপেরে শহরে। ভর্তি হন এডভান্সড ইঞ্জিনিয়ারিং ফিজিক্সে। গবেষণা করেন ফটোটিকস নিয়ে। মূলত এই স্কলারশিপটিই নিখিলের জীবন বদলে দেয়। নিজেকে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি পার্ট-টাইম চাকরি করে মায়ের কাছে টাকা পাঠানো, পিএইচডি ও চাকরির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করা— এ সবকিছু তখন তিনি একহাতে সামলেছেন। ২০২০ সালের শুরুর দিকে নিখিলের স্নাতকোত্তর সম্পন্ন হয়। এর কিছুদিন পরেই বিশ্বসেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে ও মাইক্রোসফট থেকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাক পান। হুয়াওয়েতে শেষ ধাপে বাদ পড়লেও মাইক্রোসফটে ঠিকই টিকে যান তিনি।

যেকোনো তরুণের মতোই মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানে চাকরি, প্রত্যাশার অতিরিক্ত ছিল নিখিলের কাছে। মাইক্রোসফট থেকে তাকে যখন অভিনন্দন জানানো হয়, তখনও নিখিল বিশ্বাস করতে পারেননি। এমনকি অফিসে যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত কাউকে জানাননি নিজের সাফল্যের কথা। এতটাই উত্তেজিত ছিলেন যে, ওই সময়ে তার দেশে ফেরার কথা থাকলেও সেটি স্থগিত করে তখনই মাইক্রোসফটের এসপো শাখায় যোগদান করেন।

নিজের সাফল্যের পেছনে মায়ের অবদানকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন নিখিল। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার মা। তিনি ছিলেন আমার বড় সাপোর্ট। কোনোদিন আমার উপরে কোনো কিছু চাপিয়ে দেননি, সবসময় নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি। বাবার মৃত্যুর পর স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলি আমরা। সংসারের হাল ধরতে মা তখন গার্মেন্টসে চাকরি করেছেন। পরে সেখান থেকে চাকরি নেন একটা এনজিওতে। সেখানে দীর্ঘ ২০ বছর যাবত চাকরি করছেন।

অন্যদিকে একমাত্র সন্তানের সাফল্যের কথা জিজ্ঞেস করতেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন নিখিল দাশের মা কমলা দাশ। তিনি বলেন, ‘চাওয়ার চেয়েও আমার ছেলে আমাকে বেশি কিছু দিয়েছে। আমি অনেক খুশি।’ 

বর্তমানে নিখিল অবস্থান করছেন ফিনল্যান্ডের এসপোতে এবং  অপটিক্যাল এলিমেন্টস নিয়ে কাজ করছেন।