মামলা, হামলা ও হয়রানিতে এলাকাবাসী নাকাল
তুহিন খান
সাভারের সীমান্তবর্তী পাঁচটি গ্রামের এলাকাবাসীর কৃষিজমি ও বংশী নদীর তীর ভরাট করে গড়ে উঠেছে অনুমোদনবিহীন আকসিরগর নামে একটি আবাসন প্রকল্প। এ প্রকল্পের নেই জেলা প্রশাসকের অনুমোদন ও পরিবেশের ছাড়পত্র। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঐ আবাসন প্রকল্পের মালিক এলাকায় অল্প কিছু জমি কিনে আশপাশের অন্যদের জমিও জোরপূর্বক বালু দিয়ে ভরাট করে দখলে নিচ্ছেন। প্রকৃত জমির মালিকরা এতে প্রতিবাদ করায় গত দুই বছর ধরে এলাকার বেশ কিছু পরিবারের নারী ও পুরুষ সদস্যদের বিরুদ্ধে থানায় ও আদালতে একাধিক মামলা দায়ের করে হয়রানি করছে ঐ আবাসন কোম্পানি। সম্প্রতি এলাকাবাসীর পক্ষে নেতৃত্বদানকারী যুবক বদরুল সরদারকে একটি মিথ্যা মামলা দিয়ে জেল হাজতে পাঠানো হয়। অপরদিকে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকেও আকসিরনগর আবাসন প্রকল্পের মালিক তৌহিদুল ইসলামসহ অবৈধ প্রকল্পের একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় পুলিশ আবাসন প্রকল্পের ১১ জনকে আটকও করেছে। কিন্তু মালিক তৌহিদুল ইসলাম রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
কৃষিজমিতে জোরপূর্বক বালু ভরাটের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়েরের পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় এলাকাবাসীর পক্ষে স্থানীয় বদরুল সরদার সুপ্রিম কোর্টে মাখুলিয়া, কাইজারকুন্ড, বড় কুশিয়ারা, সীতি ও সাছনা মৌজায় কৃষিজমিতে মাটি ভরাট কার্যক্রম বন্ধের জন্য একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। এর পর আদালত উক্ত জমিতে মাটি ভরাট বন্ধের নির্দেশ জারি করেছে। তারপরও থেমে নেই অবৈধ আবাসন প্রকল্পের অপতত্পরতা।
জানা গেছে, ধামরাইয়ের কাইজারকুন্ড, মাখুলিয়া, সীতি, সাছনা, মামুরা, বড় কুশিয়ারা এলাকার বাসিন্দাদের কৃষিজমি বিক্রিতে বাধ্য করে বালু ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলেছে সাভারের ব্যাংক কলোনির তৌহিদুল ইসলাম গং। আবার অনেকের ভোগদখলীয় পৈতৃক সম্পত্তি না কিনেই জোর করে ভরাট করা হচ্ছে। কেনা জমিতে মাটি ভরাটের সময় আশপাশের জমিতে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। এতে বাধা দিলেই জমির মালিকসহ প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
সরেজমিন জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে নামসর্বস্ব ‘কাইজান গ্রুপ’ একটি আবাসন প্রকল্প শুরু করে। স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রথমে কয়েক বিঘা জমি কিনে মাটি ভরাট করেন সাভারের ব্যাংক কলোনির তৌহিদুল ইসলাম তৌহিদ। ঐ সময় অনেকের জমি না কিনেই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বাবুল হোসেনের নেতৃত্বে মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছিল। এ নিয়ে এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পর্যায়ক্রমে প্রায় অর্ধশত কৃষকের ওপর হামলা ও মামলা হয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় জনরোষ দেখা দেওয়ার পর সেটি বন্ধ করা হয়। এর এক বছর পর নাম পরিবর্তন করে ‘আকসিরনগর’ নাম দিয়ে আবার কয়েক বিঘা জমি কিনে মাটি ভরাট শুরু করেন তৌহিদুল। তিনি আশপাশের অনেক কৃষককে জমি বেচতে বাধ্য করেন। না কেনা জমিতেও বালু ফেলে তা দখলে নিয়েছেন। এর আগে তৌহিদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা কয়েকবার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভাও করেছেন। প্রশাসনের কাছে প্রতিকার চেয়ে আবেদনও করেছেন তারা। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বরং তারা হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগী বদরুল সরদার বলেন, এলাকায় অনেকের কাছ থেকে কৃষিজমি কিনে বালু ফেলে ভরাট করে আকসির নগর নামে একটি আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। ভরাটের সময় অন্যের জমিতেও বালু ফেলা হচ্ছে জোরপূর্বক। এতে মামলা হামলার ভয়ে কেউ কিছু বলতে সাহস করছে না। তার বিরুদ্ধেও মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে তাদের বিরুদ্ধেই এভাবে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। কুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কালীপদ সরকার বলেন, আকসিরনগর আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে একাধিক মানববন্ধন ও সভা করা হয়েছে। কোনো কাজ হয়নি। সরকারিভাবে এর সমাধান করা দরকার। সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়ায় আকসিরনগর আবাসন প্রকল্পের অত্যাচারে নিরীহ গ্রামবাসীকে হয়রানির সংবাদ ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের দৃষ্টি গোচর হলে তিনি আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে ব্যবস্থা নিতে বলেন ধামরাই থানা পুলিশকে। এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১১ জনকে গ্রেফতার করে।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় থানায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছি। তারা যত শক্তিশালীই হোক না কেন ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। অভিযোগ প্রসঙ্গে তৌহিদুল ইসলাম বলেন, তিনি কারো জমি দখল বা ভরাট করেননি ।এলাকার একটি মহল ব্যবসায়িক ফায়দা লুটতে প্রকল্পের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে ।
