নিজেকে রক্ষা করিবার অধিকার সকলেরই রহিয়াছে; কিন্তু এই অধিকার অনেক সময় স্বীকার করা হয় না। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশের সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিয়া থাকে। বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেয়। আরোপ করে অর্থনৈতিক অবরোধ। নিজ দেশের তো বটে, এমনকি বন্ধুপ্রতিম দেশের শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাড়াবাড়ি প্রদর্শনকে নির্দ্বিধায় মানিয়া নেয়। বিশ্বে অশান্তি সৃষ্টির ইহা অন্যতম কারণ। কোরীয় উপদ্বীপের একটি দেশ আবারও স্বল্পমাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ করিয়াছে। ইহাকে প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য হুমকি উল্লেখ করিয়া একটি শক্তিশালী দেশ ইহার নিন্দা জানাইলে জাতিসংঘে সেই দেশটির দূত বলেন যে, তাহাদের এই অস্ত্র পরীক্ষার অধিকার রহিয়াছে। আত্মরক্ষার তাগিদে ইহার দুই দিন পূর্বে একটি দীর্ঘ পাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও চালাইয়াছে তাহারা। এই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। এইখানে সমস্যা হইল, অন্যের অস্ত্র কর্মসূচির নিন্দা জানাইলেও নিজেদের সামরিক তত্পরতা ঠিকই অব্যাহত রহিয়াছে। এমনকি মিত্রদেশ সাবমেরিন হইতে উেক্ষপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (এসএলবিএম) পরীক্ষা চালাইলেও তাহাতে নীরবতা পালন করা হয়। এই রকম দ্বিচারিতার মাশুল দিয়া যাইতেছেন শান্তিকামী বিশ্ববাসী। বিশ্বে যুদ্ধবিগ্রহ, সন্ত্রাসবাদ-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ইত্যাদি লাগিয়াই আছে।
আত্মরক্ষার অধিকার বিশ্বে আজ কতটা ভূলুণ্ঠিত—তাহা জঙ্গিবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হইতে সম্যক উপলব্ধি করা যায়। জঙ্গিবাদের সৃষ্টি কেন হইল এই কথা আমরা গুরুত্ব দিয়া চিন্তা করিতেছি না। এক দেশ যখন আরেক দেশে প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারের জন্য সেই দেশের জনগণকে দাবাইয়া রাখিবার চেষ্টা করে, তখনই অশান্তি ও অস্থিরতা তৈরি হয়। এখন প্রকাশ্যে বলা হইতেছে, এক দেশ আরেক দেশকে যেইভাবেই হউক ঠেকাইবে। এখন প্রশ্ন হইল, এই হুমকিতে সেই দেশ কি বসিয়া থাকিবে? তাহারাও এমন অস্ত্রে শান দিতেছে যাহা সেই শত্রুভাবাপন্ন দেশ বা তাহার মিত্রদেশের রাজধানীতে গিয়া সরাসরি আঘাত হানিতে পারে। শুধু সামরিক শক্তির মহড়া ও প্রতিযোগিতা নহে, বাণিজ্য যুদ্ধও পরিচালিত হইতেছে এই শত্রুতা ও রেষারেষির কারণে। মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা আরো সঙ্গিন। সেইখানে একটি দেশ নিজেকে এতটাই বেপরোয়া মনে করে যে, সে ছাড়া সেইখানে আর কেহ থাকিবে না। সে জোর করিয়া অন্যের বাড়িঘর ও জমিজমা দখল করিয়া নিতেছে দিবালোকে। যাহারা তাহাদের ঘরে আশ্রয় দিল, তাহারাই এখন বাস্তুহীন। বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া সেইখানে আত্মরক্ষার সংগ্রাম চলিতেছে। তাহাদের বসবাসের শেষ সম্বলটুকু কাড়িয়া লওয়া হইতেছে। এই কারণে বিশ্বে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের অবসান হইতেছে না। স্নায়ুযুদ্ধকালে দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ দখল করিয়া লইল এক পরাশক্তি। তাহাদের আবার উত্খাত করিয়া আরেক পরাশক্তি ও তাহাদের মিত্রদেশগুলি সেই দেশে ঘাঁটি গাড়িয়া বসিল। এই দুই পরাশক্তির কী বিজনেস ছিল সেইখানে? বিশ্ব জুড়িয়া এই অপতত্পরতা বন্ধ করা দরকার।
এইদিকে বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় এমন পরিস্থিতি দাঁড়াইয়াছে যে, তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলি ইহার কারণে আরো দরিদ্রতর হইতেছে। বুভুক্ষু থাকিয়া হইলেও অন্যের উসকানিতে তাহারা অস্ত্র কিনিতেছে বা অস্ত্র কিনিতে বাধ্য হইতেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের দুইটি দেশের মধ্যে উত্তেজনা নূতন নহে। অন্য প্রতিবেশী দেশগুলির উপর তাহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে। অতএব, যখন কোনো সংকট দেখা দিবে, তখন তাহার মূল কারণটা পূর্বে অনুসন্ধান করিতে হইবে। কোনো ব্যক্তির কোনো রোগ দেখা দিলে পূর্বে তাহার সঠিক ডায়াগনসিক করা প্রয়োজন। এই জন্য বিশ্বে অশান্তি-অস্থিরতা, যুদ্ধবিগ্রহ, জঙ্গিবাদ ইত্যাদির গোড়ায় যাইতে হইবে। স্বীকার করিয়া লইতে হইবে সকলের আত্মরক্ষার অধিকার।
