করোনাকালীন ও করোনা-উত্তর বাস্তবতা

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:১৯

মানুষের সামগ্রিক জীবনব্যবস্থার এমন কোনো দিক নেই যেখানে মহামারি করোনা স্পর্শ করেনি। আধুনিক প্রযুক্তির উত্কর্ষতায় ভরপুর বিশ্বের দাপুটে মানুষ যে এভাবে নতজানু হয়ে যাবে এক ভাইরাসের কাছে তা অনেকের কাছেই অকল্পনীয় ছিল; কিন্তু মানুষ হেরে যাওয়ার নয়। চারিদিকে মৃত্যুর ভয়-আতঙ্ককে ছাপিয়ে পুরোদস্তুর লড়াইয়ে শামিল হয়েছে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে। যেখানে জয়-পরাজয়ের হিসাবনিকাশ করলে মানুষই জিতবে। কারণ ইতিহাস এই মর্মেই সাক্ষ্য দেয় যে, মানুষ হারেনি, হেরে যাওয়ার জন্য মানুষের আর্বিভাব হয়নি। হেরেছে মনুষ্য সভ্যতাকে বিদীর্ণ করার অপপ্রয়াসে শামিল হওয়া শত্রুরা! কিন্তু আদতে করোনা মহামারির প্রকট প্রভাব আমাদের সামগ্রিক জীবনব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবেই।

ইতিমধ্যেই সমকালীন সমাজবিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করে ফেলেছেন, আসন্ন পৃথিবীর স্বরূপ উন্মোচন করতে হলে, পুরো সমাজব্যবস্থাকে করোনা-উত্তর ও করোনা-পূর্ব সমাজব্যবস্থায় বিভক্ত করতে হবে। চলমান মহামারি প্রভাবিত ভবিতব্য সমাজব্যবস্থার প্রকৃতি কেমন হবে তা চলমান সামাজিক স্বরূপ বিশ্লেষণ করলে সহজেই প্রতীয়মান হয়। করোনার সুদূরপ্রসারি প্রভাব অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও পড়েছে। সর্বোপরি কোভিডের প্রভাব পৃথিবীতে যে মানবিক সংকটের সৃষ্টি করেছে তার প্রভাব ব্যক্তিজীবনকে অতিক্রম করে সামষ্টিক জীবনের অনেক গভীরে প্রোথিত করেছে ঘনকালো অমানিশার এক বিদঘুটে অন্ধকার।

কোভিড-১৯-পূর্ব সময়ে মানুষ কখনো ভাবতেও পারেনি যে সঙ্গী, সাথি, প্রিয়জন বা আপনজনের প্রতি হূদয়ের অর্ঘ্য প্রকাশ করাতে বাধানিষেধ আরোপ করতে পারে প্রকৃতিজাত কোনো অদৃশ্য শত্রু! আধুনিক পৃথিবীর চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা যাকে অভিহিত করেছে ‘সামাজিক দূরত্ব বা পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা’ নামে! কারো কল্পনাপ্রসূত ভাবনা এমন ছিল না যে, মৃত্যুশয্যাশায়ী আপনজনের পাশে বসে অন্তিম মুহূর্তের কথাগুলো প্রকাশ করাতেও বাধানিষেধ আসতে পারে, প্রিয়জনকে ঘিরে জমে থাকতে পারে ভয়-আতঙ্কের পাহাড়!

এদিকে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাকালীন মানুষ পূর্বের তুলনায় বহু গুণ সময় ব্যয় করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে। এক্ষেত্রে একদিকে যেমন ব্যস্ততার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকাকালীন সময়ে যে সম্পর্কগুলোতে মরিচার আস্তরণ পড়ে গিয়েছিল, তাতে নতুনরূপে একটু হলেও হূদয়তাড়িত, ভালোবাসামিশ্রিত আবেগের প্রলেপ দেওয়া গেছে। এহেন সুসংবাদের সঙ্গে রয়েছে দুঃসংবাদের আবহ।

একই সঙ্গে মানুষ জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপে। সামাজিক মাধ্যমগুলো হয়ে উঠেছে মিথ্যা, বানোয়াট আর গুজবের অভয়ারণ্য। যেখানে বৃদ্ধ, যুবক থেকে শিশুরাও আছেন।

অপরদিকে এই মহামারিকালীন সময়েই আমরা দেখেছি অনেক মানবীয় দৃষ্টান্ত। চারিদিকে হূিপণ্ড কাঁপানো মৃত্যুর ভয়কে উপেক্ষা করে কিছু মানুষ এগিয়ে এসেছেন জনহিতৈষী কাজে। নিজেদের সর্বাত্মক মানবিক গুণের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর চরম-পরম সুযোগ হিসেবে নিয়ে দাঁড়িয়েছেন মানুষের পাশে। প্রমাণ করে দিয়েছেন আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর, ব্যক্তিচিন্তায় মনোনিবেশ করার মধ্যে মানবীয় দৃষ্টান্তের বা প্রকৃত মানুষের গুণাবলি প্রকাশ পায় না। বরং উদারনৈতিক হওয়ার মধ্যেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যায়।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, মহামারির ধাক্কায় প্রকম্পিত হয়ে থাকে সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা। যা ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সর্বোপরি সমাজ থেকে সামাজিক জীবনযাত্রায় বয়ে নিয়ে আসে সুদূরপ্রসারি প্রভাব। পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের পথে ধাবমান হয় সামাজিক অনুষঙ্গ ও সমাজজাত উপাদানগুলো।

আশা আর আশঙ্কায় আচ্ছন্ন প্রতিটি মানুষের জীবন। জীবনব্যবস্থাকে ঘিরে থাকা আশঙ্কাকে আশায় রূপান্তর করে মানুষ নতুনরূপে উজ্জীবিত হবে বহু গুণ বর্ধিত সঞ্জীবনী শক্তিতে। যে সঞ্জীবনী শক্তিতে মানুষ নিজেকে মানিয়ে নিবে নিউ নর্মাল নামক নব্য উদ্ভূত সমাজব্যবস্থায়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়