নালায় পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সেহেরীনের মৃত্যুর ঘটনার পর নাগরিক সেবা সংস্থাসমূহের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। এই সমন্বয়হীনতা এবং সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণেই চট্টগ্রাম মহানগরীর নালা-নর্দমাসহ সড়ক ব্যবস্থাপনার এমন বেহাল অবস্থা—এমনটাই মনে করছেন নগরীর সচেতন মহল। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, সিডিএ এবং ওয়াসার মতো প্রধান সংস্থাসমূহের পরস্পরকে দোষারোপের সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। আবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং মহানগরীকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার দায়িত্বে নিয়োজিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের মধ্যে বেশ কয়েক বছর ধরে দূরত্ব সৃষ্টির কারণেও অনেক ক্ষেত্রে নগরবাসী কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
চট্টগ্রাম মহানগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে সরকার মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প পেতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সরকার চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রদান করে। এরপর ঐ প্রকল্প নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবং সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যানকে অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থান নিতে দেখা যায়। পরবর্তী সময় বর্তমান মেয়র রেজাউল করিম এবং সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা চালান। কিন্তু বর্ষা কিংবা সড়ক, নালা-নর্দমা নিয়ে কোনো সমস্যা দেখা দিলে উভয় প্রতিষ্ঠানকেই পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপমূলক বিবৃতি দিতে দেখা যায়। কেউ দায়দায়িত্ব নিতে চান না। এর ফলে সংস্থাসমূহের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্বে অবহেলা কিংবা দুর্নীতি-অনিয়মের মতো অপরাধ করেও পার পেয়ে যান।
চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা প্রকল্প গ্রহণ করার পর কোন কোন খাল-নালা সংস্কার কিংবা নতুন করে খনন করা হবে তা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ১০ কিলোমিটার নালা-খাল, কালভার্ট নির্মাণ বা সংস্কার করা জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়েছে। বাকি অধিকাংশ পুরাতন নালা-নর্দমা, খাল সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা সিটি করপোরেশনের আওতায় পড়ে। সিডিএর সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, সিডিএ ও সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে খাল, নালা, নর্দমা, কালভার্ট নির্দিষ্ট করা আছে। তিনি জানান, সিডিএ জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ করছে তিন বছর ধরে। প্রকল্পটির জন্য পর্যাপ্ত টাকা ছাড় না হওয়ায় এবং দীর্ঘদিনের এ সমস্যা নিরসন করা কষ্টসাধ্য হওয়ায় প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে নগরীর অবৈধ ভবন, বাসাবাড়ি এবং অবকাঠামো। নগরীতে বিশালসংখ্যক ভবন, মার্কেট ও স্থাপনা নকশাবহির্ভূত কিংবা নকশাবিহীন অবস্থায় করায় তা ভাঙতে এবং উচ্ছেদ করতে বেগ পেতে হচ্ছে সিডিএর লোকজনকে। এতে করে প্রকল্পের ব্যয় এবং সময় দুটোই বেড়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান। সিডিএর অথরাইজড বিভাগের প্রত্যেক এলাকায় ইন্সপেক্টর এবং কর্মকর্তা থাকলেও তাদের গাফিলতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে নগরীতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ অনেক ক্ষেত্রে উত্সাহিত হচ্ছে বলে অনেকের অভিমত।
আবার নগরীর নালা-নর্দমা পরিষ্কার রাখা এবং নতুন নালা-নর্দমা, খাল নির্মাণ কিংবা সংস্কার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মূল দায়িত্ব হলেও তারা সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কি না সে ব্যাপারে প্রশ্ন রয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ৪১টি ওয়ার্ডে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য প্রতিদিন যে নির্দিষ্টসংখ্যক পরিচ্ছন্ন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয় তারা যথাযথভাবে কাজ করছে কি না তা সঠিকভাবে তদারকি হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন খাল নির্মাণের একাধিক প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। নগরীর আগ্রাবাদ বক্স কালভার্ট তথা দেওয়ানহাট থেকে বন্দরের ১ নম্বর জেটি পর্যন্ত সড়কের নিচ দিয়ে যে বক্স কালভার্ট রয়েছে তা প্রতিনিয়ত পরিষ্কার করার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না। ফলে স্বাভাবিক পানি প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে।
সড়ক, নালা-নর্দমা অরক্ষিত পড়ে থাকলেও কোনো প্রকার জবাবদিহিতা না থাকায় মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটছে। গত তিন মাসে অরক্ষিত সড়ক ও নালার কারণে তিন জনের প্রাণহানি ঘটেছে। প্রতিবছরই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। নগরীর আগ্রাবাদ বাদামতলী এলাকায় অরক্ষিত নালায় পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সেহেরীন মাহবুব সাদিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার কিছুদিন আগেই সালেহ আহমদ নামে এক ব্যক্তি নগরীর মুরাদপুর এলাকায় অরক্ষিত নালার পানিতে ভেসে যান। সেহেরীনের লাশ উদ্ধার করা গেলেও সালেহ আহমদকে আর পাওয়া যায়নি। কিন্তু সিডিএ এবং সিটি করপোরেশনের শীর্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে দোষারোপের বাগ্যুদ্ধ আজও শেষ হয়নি।
‘এ মৃত্যুর দায় এড়ানো যায় না’
নগরীর আগ্রাবাদে গত সোমবার রাতে নালায় পড়ে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সেহেরীন মাহবুব সাদিয়ার মৃত্যুকে মর্মান্তিক বেদনাদায়ক ও দুঃখজনক বলে আখ্যায়িত করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত ষষ্ঠ পরিষদের অষ্টম সাধারণ সভায় সেহেরীনের মৃত্যুতে একটি শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় এবং নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নাজমুল হক (ডিউক) ইত্তেফাককে বলেন, এই মৃত্যুর দায় করপোরেশন অস্বীকার করতে পারে না। সভায় ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার আর কোনো পুনরাবৃত্তি না হয় সে ব্যাপারে নজর রাখার কথা বলা হয়। কাউন্সিলর ডিউক বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে আগে একটি ডাস্টবিন ছিল, ফলে পথচারীরা নালার পাশ দিয়ে যাতায়াত করতে পারত না। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজের জন্য ডাস্টবিনটি ভেঙে ফেলা হলে লোকজন নালার পাশ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত শুরু করে। এ বিষয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএর খেয়াল রাখা উচিত ছিল। প্রয়োজন ছিল স্থানটি চিহ্নিত করে রাখা।
