বিভিন্ন পণ্যে ছাড়ের অফার দিয়ে আসা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘ধামাকা শপিং ডট কমে’র লক্ষ্যই ছিল প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাত্। কোনো ধরনের অনুমোদন ও লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা শুরু করার ছয় মাসের মধ্যেই অফারের প্রলোভন দেখিয়ে ৩ লাখ গ্রাহক তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি। ধামাকা সর্বমোট ৭৫০ কোটি টাকার লেনদেন করলেও বর্তমানে অ্যাকাউন্টে রয়েছে লাখ টাকারও কম। এসব টাকা ধামাকার মালিকেরা ধীরে ধীরে নিজেদের অ্যাকাউন্টে সরিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির কাছে বর্তমানে পণ্যবিক্রেতাদের বকেয়া প্রায় ২০০ কোটি টাকা, ক্রেতাদের বকেয়া ১৫০ কোটি টাকা এবং গ্রাহকদের রিফান্ড চেক বকেয়া রয়েছে প্রায় ৩০-৪০ কোটি টাকা।
গতকাল বুধবার ভোরে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে ধামাকা শপিংয়ের চিফ অপারেশন অফিসার (সিওও) সিরাজুল ইসলাম রানাসহ (৩৪) তিন জনকে গ্রেফতার করে র্যাব-২। গ্রেফতার বাকি দুই জন হচ্ছেন ধামাকা শপিংয়ের মোবাইল ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ক্যাটাগরি হেড ইমতিয়াজ হাসান সবুজ (৩১) এবং ইলেকট্রনিকস ক্যাটাগরির হেড ইব্রাহিম স্বপন (৩৩)।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর কাওরান বাজার র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। ধামাকার মূল হোতা জসিম উদ্দিন চিশতি কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিনি পলাতক, আমরা জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতদের মাধ্যমে জেনেছি, তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। আমরা তাকেসহ অন্য আসামিদের খুঁজছি।’
এর আগে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, সিরাজগঞ্জ শপসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে শুধু ই-অরেঞ্জই ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা লোপাট করেছে। ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী মাসুকুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক বনানী থানার ওসি (তদন্ত) শেখ সোহেল রানা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভারতে গ্রেফতার হয়েছেন। ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ‘নিরাপদ ডটকম’ নামের একটি ই-কমার্স সাইটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকেও (সিইও) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শাহরিয়ার খান নামে ঐ ব্যক্তি ই-কমার্স সাইট খুলে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। ইভ্যালির এমডি মোহাম্মদ রাসেল ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোছা. শামীমা নাসরিনকেও গ্রেফতার করেছে র্যাব। কাস্টমার ও মার্চেন্টদের কাছে ই-কমার্স প্ল্যাটফরম ইভ্যালির প্রকৃত দেনার পরিমাণ ৫৪৪ কোটি টাকা। দায়ের বিপরীতে তাদের চলতি সম্পদ রয়েছে ৯০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আর সম্পত্তি, স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি মিলিয়ে রয়েছে ১৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
র্যাব কর্মকর্তা খন্দকার আল মঈন বলেন, ২৩ সেপ্টেম্বর টঙ্গী পশ্চিম থানায় এক ভুক্তভোগীর দায়েরকৃত মামলা ও বেশ কিছু ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে ধামাকা শপিংয়ের সিওওসহ তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৮ সালে ‘ধামাকা ডিজিটাল’ যাত্রা শুরু করলেও ২০২০ সাল থেকে ‘ধামাকা শপিং ডট কম’ নামে কার্যক্রম শুরু করে। ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নেতিবাচক অ্যাগ্রেসিভ কৌশল নিয়ে মাঠে নামে।
তিনি বলেন, ধামাকা শপিংয়ের কোনো ধরনের অনুমোদন ও লাইসেন্স নেই, ব্যাবসায়িক অ্যাকাউন্টও নেই। ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ব্যাবসায়িক লেনদেন করা হয়েছে। গ্রাহকদের সঙ্গে এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। অথচ বর্তমানে অ্যাকাউন্টে ১ লাখ টাকারও কম রয়েছে।
গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে কয়েক মাস ধরে প্রতিষ্ঠানের অফিস ও ডিপো ভাড়া বকেয়া রয়েছে। গত জুন থেকে কর্মচারীদের বেতনও বকেয়া। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ‘ধামাকা শপিং ডট কম’ অর্থ অন্যত্র সরিয়ে ফেলার কাজ শুরু করে, যার ফলে বর্তমানে ধামাকার প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
মহাখালীতে তাদের প্রধান কার্যালয়ে এবং তেজগাঁও বটতলা মোড়ে একটি ডেলিভারি হাব রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৬০০ ব্যাবসায়িক চেইন রয়েছে, এর মধ্যে নামিদামি প্রতিষ্ঠানের নামও উঠে এসেছে। ধামাকার পরিচালনা পর্ষদের ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেড, মাইক্রোট্রেড ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড, মাইক্রোট্রেড আইসিক্স লিমিটেডসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। গ্রাহক চেইন বা নেটওয়ার্ক থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই ছিল ধামাকার কৌশল। এছাড়া ‘হোল্ড মানি প্রসেস প্ল্যান’, অর্থাত্ গ্রাহক ও সরবরাহকারীর টাকা আটকে রেখে অর্থ সরিয়ে ফেলা ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ধামাকার গ্রাহকসংখ্যা ৩ লাখের বেশি। প্রতিষ্ঠানটি গত এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ২০ শতাংশ পণ্য সরবরাহ করে অর্থ সরিয়ে গ্রাহকদের চেক প্রদান করে। বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার গ্রাহকের বকেয়া রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত অক্টোবর থেকে তারা অ্যাগ্রেসিভ বিজনেসে যায়। ধামাকা খুব অল্প সময়েই প্রচুর টাকা সরিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ১৪টি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে। সিআইডির তদন্তেও ১১৬ কোটি টাকা অস্বচ্ছতার বিষয়টি উঠে এসেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানোর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ শুরু করেছে। যাদের বিরুদ্ধেই মামলা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অর্থ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের কর্মকর্তা খন্দকার আল মঈন বলেন, সাধারণ গ্রাহকেরা যে টাকা দিয়েছে তা গেছে ইনভেরিয়েন্ট টেলিকমের অ্যাকাউন্টে। ধামাকার মালিকদের আরো অনেক ব্যবসা রয়েছে, সেই সব ব্যবসায় এই টাকা স্থানান্তর করা হতে পারে। এছাড়া মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসবে। মূল হোতা জসিম উদ্দিন চিশতির নিজস্ব সম্পদ রয়েছে ২৫০ কোটি টাকার ওপরে, সেখানেও ধামাকার গ্রাহকদের টাকা যেতে পারে।
