ভর্তিযুদ্ধে জয়ী হওয়া দেশসেরা ৪ মেধাবীর গল্প

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২১, ০০:২৩

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিহাস-ঐতিহ্যে ভরপুর, স্বপ্নের এক ক্যাম্পাস। চোখ জুড়ানো কার্জন, টিএসসি, কলাভবন কিংবা এফবিএস—হাজারো মেধাবীর পদচারণায় মুখরিত বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় এই বিদ্যাপীঠ। করোনা মহামারীর সুদীর্ঘ এক অপেক্ষা শেষে ১লা অক্টোবর শুরু হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। গত শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ক, খ, গ, ঘ ইউনিটে প্রথম হওয়া চারজন অনলাইন আড্ডায় এক হয়েছিলেন ইত্তেফাক অনলাইনের সাথে।

সেরা চারজনের প্রথমবার একসাথে হওয়া ইত্তেফাকের সূত্র ধরেই। ২০১৯ শিক্ষাবর্ষে ক ইউনিটে মো. ইশরাক আহসান, খ ইউনিটে আফরাজ আরশিয়ান, গ ইউনিটে জাকির হোসেন শান্ত আর ঘ ইউনিটে প্রথম হয়েছিলেন মুনেম আল আজাদ। ইশরাক ছাড়া বাকি তিনজনই বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আছেন। ইশরাক পড়াশুনা করছেন বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে। চলুন শুনে আসা যাক, তাদের প্রথম হওয়ার গল্প!

স্কুল কলেজের অনুপ্রেরণার কোনো গল্প জানতে চাওয়া হলে, মুনেম থেকে শোনা হলো সেন্ট যোসেফ জীবনের ম‍্যাথ ক্লাবের মডারেটর দীপক কুমার সরকার স্যারের কান্নাভেজা অনুপ্রেরণার গল্প। ভর্তি পরীক্ষার আগে একদম শেষ সময়টুকু কিভাবে কাটিয়েছিলেন, জানতে চাইলে ইশরাক বলেন, 'যেহেতু বুয়েটের জন্যই মূলত প্রিপারেশন নেওয়া আর তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও অর্ধেক অংশ লিখিত শুরু করেছে, কাজেই লিখিত নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতে হয়নি আমাকে।' সাথে আরশিয়ান যুক্ত করলেন, 'আমার মতে, শেষ সময়ে এসে যেই টপিকগুলো প্রতিবছরই এসে থাকে সেইগুলো শেষবার দেখা নেওয়া আর পুরোনো পড়াগুলোই রিভিশন দেওয়া বেশ জরুরি।'

গ ও ঘ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে যথাক্রমে ২২ ও ২৩ অক্টোবর। শেষ ৩ সপ্তাহের প্রস্তুতি নিয়ে গ ইউনিটে প্রথম হওয়া জাকির বলেন, 'আমার ফোকাস ছিল মূলত এমসিকিউ-এর উপর, কারণ রিটেনের তুলনায় এমসিকিউ অংশে খুব সহজেই নম্বর তোলা যায়। আর আমি প্রশ্ন অ্যানালাইসিস করে যা বুঝেছিলাম, গ ইউনিটে সাধারণত বাংলা প্রথম পত্র থেকে গভীর প্রশ্ন দেয়না। এজন্য কমার্সের সাবজেক্ট গুলোর উপর বেশি জোর দিয়েছিলাম।'

বাংলাদেশের ভর্তি পরীক্ষাকে বরাবরই ভর্তিযুদ্ধের সাথে তুলনা করে হয়ে থাকে। আর পরীক্ষাটা যখন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের, তখন তো আর কথাই নেই। কারণটাও খুব স্পষ্ট। এবছর ৩ লক্ষ ২৪ হাজার ৩৪০ জন পরীক্ষার্থীর বিপরীতে আসন সংখ্যা মাত্র ৭,১৪৮টি। এই যুদ্ধের সেরা চার যোদ্ধার মাঝে এবার আসা যাক  আরশিয়ানের কাছে। পরীক্ষার আগের রাতে ভালো মতো ঘুমানোর গুরুত্ব মনে করিয়ে দিয়ে জানালেন, 'পরীক্ষার হলে যেহেতু ঘড়ি থাকছে না, কাজেই সময়ের মাঝে দ্রুত লিখে শেষ করার বিষয়টি মাথায় রাখা অনেক দরকারই বটে। এজন্য শেষ সময়ে বাসায় ঘড়ি না দেখে অনুশীলন করাটা বেশ কাজে আসবে।'

পরীক্ষার হলের দেড় ঘন্টা সময়ের ব্যাপারে পরামর্শ দিতে গিয়ে জাকির বলেন, 'লিখিত অংশের সময়টায় জ্ঞানমূলক ও অনুধাবনমূলক বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর করে নিয়ে এরপর বর্ণনামূলক প্রশ্নগুলোর উত্তর করা উচিত। তাহলে সহজেই মার্কস তুলে ফেলা যায়।' জাকিরের এই পরামর্শের সাথে এরপর ইশরাকও সহমত পোষণ করে বলেন, 'লিখিত প্রশ্নের ক্ষেত্রে যেহেতু আংশিক মার্কস পাওয়ারও সম্ভাবনা থাকে, সেহেতু পুরোপুরি উত্তর করে আসাটা খুবই জরুরি। আমার ক্ষেত্রে স্ট্রাটেজি মূলত এটাই ছিলো।'

৯৯.২৫ পেয়ে খ ইউনিটে প্রথম হওয়া আরশিয়ান এমসিকিউ উত্তর করা নিয়ে বলেন, 'একদমই অজানা কয়েকটা প্রশ্ন ছাড়া বাকি সবগুলোই উত্তর দাগানো উচিত, কারণ সেক্ষেত্রে মার্কস পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।'  বাকি তিনজনের থেকে কিছুটা ভিন্ন গল্প মুনেমের। বিজ্ঞান থেকে ঘ ইউনিটে বিভাগ পরিবর্তন করে প্রথম হয়েছেন তিনি। অ্যাডমিশনের গল্পের শুরু মেডিকেল আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘ ইউনিটের প্রস্তুতি দিয়ে হলেও এক পর্যায়ে ঘ ইউনিটেই মূল ফোকাস ছিল, গল্পের একপর্যায়ে জানান তিনি। মেডিকেলে খারাপ পরীক্ষা দিয়েও মনোবল ঠিক রেখেছিলেন পুরোটাই। যেই দৃঢ়তাই তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘ ইউনিট ভর্তিযুদ্ধে সফল করেছে।

আচ্ছা ভাবুন তো! এই ৪ জন শিক্ষার্থীর দেশসেরা বনে যাওয়ার প্রথম মুহূর্তগুলো কত বেশি সুন্দর ছিল! লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর আরাধ্য একটা ফ্রেমে নিজেকে দেখতে পাওয়ার অনুভূতি নিয়ে জানতে চাইলে, সমস্বরে হাসিমুখে বললেন সবাই, 'এই অনুভূতি কোনোভাবেই প্রকাশ করার মতো না'। পরীক্ষা আর রেজাল্টের মাঝের সময়টুকুর উদ্বেগ ব্যাখ্যা করে আরশিয়ান বলেন, রেজাল্ট দেখার পর বিশ্বাস হচ্ছিল না, অবিশ্বাস্য সুন্দর একটা অনুভূতি কাজ করছিল। গ ইউনিটে ১২০ এর মধ্যে ১০০ পাওয়ার টার্গেট নিয়ে  প্রিপারেশন নিয়েছিলেন জাকির। নিজের পরিশ্রম দিয়ে এটাকে বাস্তবে রূপান্তর করে সত্যি সত্যিই প্রথম হয়ে গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আরাধ্য এই জায়গায় পৌঁছানো সেরা চার মেধাবীর থেকে নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছা করছে তাদের ভবিষ্যত স্বপ্নের কথা? এই প্রশ্নের উত্তরে তারা জানালেন, আপাতত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই ফোকাস করতে চান। মুনেমের মতে, তিনি নিজে শর্ট টার্ম প্ল্যানিং এ বিশ্বাস করেন, কাজেই আপাতত ডিপার্টমেন্টে ভালো ফলাফল করতে চান। আরশিয়ান আর ইশরাকেরও একই ধরনের বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর। নিজেদের পড়াশোনায় মন দিয়ে সব সুযোগ ও সম্ভাবনা খুঁজে বের করে শেষমেশ নিজের ভালোলাগার ক্ষেত্র বেছে নিতে চান। একইসঙ্গে জাকির ব্যক্ত করলেন, মানুষের জন্য কাজ করার তীব্র বাসনা আছে তার।

রাত পেরোলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিযুদ্ধ। স্বপ্নের ক্যাম্পাসটাকে আজীবন নিজের করে নেয়ার যুদ্ধে যাওয়া এবারের ভর্তিযোদ্ধাদের শুভকামনা জানিয়েছেন শীর্ষ এই চার মেধাবী। ভর্তিযোদ্ধাদের অনেকের স্বপ্নের তরী নিশ্চয়ই ভিড়বে দেশসেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে।

ইত্তেফাক/এসটিএম